০৮:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ২০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি নিয়ে অস্বস্তি, সরকার বলছে সংকট নেই

  • Sangbad365 Admin
  • সময়ঃ ১২:০০:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬
  • ১৬০০৪ Time View

ঢাকার মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী যেদিকেই যাওয়া হোক, পেট্রোল পাম্পের সামনে একই দৃশ্য। সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, বাস। কোথাও আধাঘণ্টা, কোথাও এক ঘণ্টার বেশি অপেক্ষার পর মিলছে তেল। আবার অনেক পাম্পে দুপুরের আগেই ঝুলছে তেল নেই সাইনবোর্ড।

এই বাস্তবতার মধ্যেই সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে পাম্প মালিক ও ভোক্তাদের একটি অংশ বলছে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে এমন পরিস্থিতি হওয়ার কথা নয়।

সরকারের ব্যাখ্যা চাহিদা বেড়েছে
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। প্রতিটি পাম্পে নিয়মিত বরাদ্দ অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।”

তবে তিনি স্বীকার করেন, “সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই চাপ তৈরি হয়েছে। আগে একটি পাম্পে যে পরিমাণ তেল দেওয়া হতো, তা বিক্রি হতে এক থেকে দেড় দিন লাগত। এখন বাড়তি চাহিদার কারণে দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। অনেকে প্রয়োজনের বেশি তেল নিচ্ছেন। এতে করে লাইনের সৃষ্টি হচ্ছে এবং সংকটের ধারণা তৈরি হচ্ছে।”

কৃত্রিম সংকট রোধে অভিযান
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অবৈধ মজুতের চেষ্টা রুখতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সরবরাহ চুক্তি ফোর্স মেজরের আওতায় পড়লেও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।”

তিনি জানান, বর্তমানে জ্বালানি আমদানি ও পরিশোধন কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ক্রুড অয়েল পরিশোধন অব্যাহত আছে। ফলে সরবরাহে বড় ধরনের কোনো বিঘ্ন নেই বলে দাবি করেন তিনি।

তেলের অভাবে অনেক সময় বন্ধ থাকছে পেট্রোলপাম্প। ছবি: সাইফ


মজুতদারি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে ইতোমধ্যে অভিযান চলছে। কোথাও অবৈধভাবে জ্বালানি মজুতের প্রমাণ মিললে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। উদ্ধার করা জ্বালানি স্থানীয় বাজারে বিদ্যমান দামে বিক্রি করা হচ্ছে।”

মাঠের চিত্র
সরকারি এই বক্তব্যের বিপরীতে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। অনেক পাম্পে সকালে সরবরাহ এলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি পাম্পের কর্মচারী তৌহিদ বলেন, “আগে এক দিনের তেল এক দিনেই বিক্রি হতো। এখন দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরপর আর দেওয়ার মতো কিছু থাকে না।”

পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠনের নেতা বলছেন, চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহেও ঘাটতি আছে। তাদের দাবি, অনেক এলাকায় আগের তুলনায় কম তেল পাওয়া যাচ্ছে।

কাজলা ফাতেমা পাম্পের মালিক জহির হোসেন বলেন, “সরকার বলছে ঘাটতি নেই, কিন্তু আমাদের বরাদ্দ আগের মতো নেই। চাহিদা বেড়েছে ঠিক, কিন্তু সরবরাহ যদি একই থাকত, তাহলে এত দ্রুত শেষ হওয়ার কথা না। সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা এবং পরিবহনে বিলম্ব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।”

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ও ট্যাংকলরি মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ এর দাবি অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি পেট্রোল পাম্প আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী অঞ্চলে সংকট বেশি প্রকট। অনেক পাম্প দিনে কয়েক ঘণ্টা খোলা রেখে সীমিত তেল বিক্রি করছে।

সংগঠনটির একজন নেতা বলেন, “সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আরো পাম্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ডিজেল ও অকটেন দুটিতেই ঘাটতি কিছু এলাকায় সরবরাহ নেমে এসেছে অর্ধেকের কাছাকাছি।”

এদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কৃষকদের জন্য ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করে তেল বিতরণ করা হচ্ছে। এতে করে সেচ মৌসুমে কৃষি উৎপাদনে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে নজর রাখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

কিছু স্থানে অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের আগে তেল পাচ্ছেন। তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ নাকচ করা হয়েছে।

তেলের জন্য অপেক্ষা। ছবি: আসাদ


বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “এ ধরনের কোনো নির্দেশনা নেই। সবাইকে সমানভাবে জ্বালানি সরবরাহের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।”

বিকল্প উৎসের দিকে নজর
সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে সরবরাহ আরো স্থিতিশীল করতে নতুন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক বাজার থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

জনজীবনে প্রভাব বাড়ছে
জ্বালানি সরবরাহ ঘিরে এই অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে পরিবহন ও পণ্য সরবরাহে। অনেক বাস ও ট্রাক নিয়মিত ট্রিপ দিতে পারছে না। এতে ভাড়া বাড়ার পাশাপাশি পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বন্ধন পরিবহনের চালক সোলায়মান বলেন, “লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট হচ্ছে। দিনে যত ট্রিপ দেওয়ার কথা, তা দেওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে জ্বালানি বাজারে এখন এক ধরনের দ্বিধা তৈরি হয়েছে। সরকার বলছে, সরবরাহে ঘাটতি নেই; অন্যদিকে মাঠে দেখা যাচ্ছে তেল দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, লাইন বাড়ছে।”

নগরজুড়ে পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি নিতে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইনের কারণে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। নগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের সারি কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। অনেকেই ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতেই ফিরছেন।

যাত্রবাড়ী মেসার্স মা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বাইকার ও প্রাইভেটকারের লাইন। তেল সংকটের কারণে বিভিন্ন পাম্পে জ্বালানি সরবরাহে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোথাও মোটরসাইকেলে ২০০ টাকা, কোথাও ৫০০ টাকার বেশি পেট্রোল বা অকটেন দেওয়া হচ্ছে না। প্রাইভেটকারে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকার জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

এদিকে, শহরের অনেক পেট্রোল পাম্পে মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় বিক্রি বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। এতে দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। মা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো. আলম বলেন, “স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি তেল বিক্রি করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই সংকট কাটবে না।”

ট্যাগঃ

জ্বালানি নিয়ে অস্বস্তি, সরকার বলছে সংকট নেই

সময়ঃ ১২:০০:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকার মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী যেদিকেই যাওয়া হোক, পেট্রোল পাম্পের সামনে একই দৃশ্য। সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, বাস। কোথাও আধাঘণ্টা, কোথাও এক ঘণ্টার বেশি অপেক্ষার পর মিলছে তেল। আবার অনেক পাম্পে দুপুরের আগেই ঝুলছে তেল নেই সাইনবোর্ড।

এই বাস্তবতার মধ্যেই সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে পাম্প মালিক ও ভোক্তাদের একটি অংশ বলছে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে এমন পরিস্থিতি হওয়ার কথা নয়।

সরকারের ব্যাখ্যা চাহিদা বেড়েছে
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। প্রতিটি পাম্পে নিয়মিত বরাদ্দ অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।”

তবে তিনি স্বীকার করেন, “সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই চাপ তৈরি হয়েছে। আগে একটি পাম্পে যে পরিমাণ তেল দেওয়া হতো, তা বিক্রি হতে এক থেকে দেড় দিন লাগত। এখন বাড়তি চাহিদার কারণে দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। অনেকে প্রয়োজনের বেশি তেল নিচ্ছেন। এতে করে লাইনের সৃষ্টি হচ্ছে এবং সংকটের ধারণা তৈরি হচ্ছে।”

কৃত্রিম সংকট রোধে অভিযান
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অবৈধ মজুতের চেষ্টা রুখতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সরবরাহ চুক্তি ফোর্স মেজরের আওতায় পড়লেও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।”

তিনি জানান, বর্তমানে জ্বালানি আমদানি ও পরিশোধন কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ক্রুড অয়েল পরিশোধন অব্যাহত আছে। ফলে সরবরাহে বড় ধরনের কোনো বিঘ্ন নেই বলে দাবি করেন তিনি।

তেলের অভাবে অনেক সময় বন্ধ থাকছে পেট্রোলপাম্প। ছবি: সাইফ


মজুতদারি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে ইতোমধ্যে অভিযান চলছে। কোথাও অবৈধভাবে জ্বালানি মজুতের প্রমাণ মিললে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। উদ্ধার করা জ্বালানি স্থানীয় বাজারে বিদ্যমান দামে বিক্রি করা হচ্ছে।”

মাঠের চিত্র
সরকারি এই বক্তব্যের বিপরীতে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। অনেক পাম্পে সকালে সরবরাহ এলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি পাম্পের কর্মচারী তৌহিদ বলেন, “আগে এক দিনের তেল এক দিনেই বিক্রি হতো। এখন দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরপর আর দেওয়ার মতো কিছু থাকে না।”

পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠনের নেতা বলছেন, চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহেও ঘাটতি আছে। তাদের দাবি, অনেক এলাকায় আগের তুলনায় কম তেল পাওয়া যাচ্ছে।

কাজলা ফাতেমা পাম্পের মালিক জহির হোসেন বলেন, “সরকার বলছে ঘাটতি নেই, কিন্তু আমাদের বরাদ্দ আগের মতো নেই। চাহিদা বেড়েছে ঠিক, কিন্তু সরবরাহ যদি একই থাকত, তাহলে এত দ্রুত শেষ হওয়ার কথা না। সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা এবং পরিবহনে বিলম্ব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।”

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ও ট্যাংকলরি মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ এর দাবি অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি পেট্রোল পাম্প আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী অঞ্চলে সংকট বেশি প্রকট। অনেক পাম্প দিনে কয়েক ঘণ্টা খোলা রেখে সীমিত তেল বিক্রি করছে।

সংগঠনটির একজন নেতা বলেন, “সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আরো পাম্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ডিজেল ও অকটেন দুটিতেই ঘাটতি কিছু এলাকায় সরবরাহ নেমে এসেছে অর্ধেকের কাছাকাছি।”

এদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কৃষকদের জন্য ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করে তেল বিতরণ করা হচ্ছে। এতে করে সেচ মৌসুমে কৃষি উৎপাদনে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে নজর রাখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

কিছু স্থানে অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের আগে তেল পাচ্ছেন। তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ নাকচ করা হয়েছে।

তেলের জন্য অপেক্ষা। ছবি: আসাদ


বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “এ ধরনের কোনো নির্দেশনা নেই। সবাইকে সমানভাবে জ্বালানি সরবরাহের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।”

বিকল্প উৎসের দিকে নজর
সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে সরবরাহ আরো স্থিতিশীল করতে নতুন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক বাজার থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

জনজীবনে প্রভাব বাড়ছে
জ্বালানি সরবরাহ ঘিরে এই অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে পরিবহন ও পণ্য সরবরাহে। অনেক বাস ও ট্রাক নিয়মিত ট্রিপ দিতে পারছে না। এতে ভাড়া বাড়ার পাশাপাশি পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বন্ধন পরিবহনের চালক সোলায়মান বলেন, “লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট হচ্ছে। দিনে যত ট্রিপ দেওয়ার কথা, তা দেওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে জ্বালানি বাজারে এখন এক ধরনের দ্বিধা তৈরি হয়েছে। সরকার বলছে, সরবরাহে ঘাটতি নেই; অন্যদিকে মাঠে দেখা যাচ্ছে তেল দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, লাইন বাড়ছে।”

নগরজুড়ে পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি নিতে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইনের কারণে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। নগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের সারি কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। অনেকেই ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতেই ফিরছেন।

যাত্রবাড়ী মেসার্স মা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বাইকার ও প্রাইভেটকারের লাইন। তেল সংকটের কারণে বিভিন্ন পাম্পে জ্বালানি সরবরাহে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোথাও মোটরসাইকেলে ২০০ টাকা, কোথাও ৫০০ টাকার বেশি পেট্রোল বা অকটেন দেওয়া হচ্ছে না। প্রাইভেটকারে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকার জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

এদিকে, শহরের অনেক পেট্রোল পাম্পে মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় বিক্রি বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। এতে দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। মা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো. আলম বলেন, “স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি তেল বিক্রি করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই সংকট কাটবে না।”