০২:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনিয়মিত মাসিক থেকে বন্ধ্যত্ব: সচেতনতাই প্রাথমিক সমাধান

  • Sangbad365 Admin
  • সময়ঃ ১২:০৪:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
  • ১৬০০৩ Time View

অনিয়মিত মাসিক, হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া, ব্রণ, অতিরিক্ত লোম, ডিম্বস্ফুটনের সমস্যা কিংবা সন্তান ধারণে জটিলতা—নারীর জীবনের এসব সমস্যাকে অনেক সময় লজ্জা, ভয় বা অবহেলার কারণে আড়ালেই রাখা হয়। অথচ এসব লক্ষণের পেছনে থাকতে পারে পলি এন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা ‘পিএমওএস’, যা শুধু মাসিক চক্র নয়, নারীর হরমোনের ভারসাম্য, মেটাবলিজম, ওভুলেশন এবং ভবিষ্যৎ মাতৃত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

‘সুস্থ নারী সমৃদ্ধ আগামী’ বিশেষ শীর্ষক অনলাইন আলোচনায় এ কথা উঠে আসে। জুন মাস ইনফার্টিলিটি সচেতনতার মাস। শুধু এ মাসকে কেন্দ্র করে নয়, বরং সারা বছরই নারীর প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা জরুরি। প্রথম আলো ডটকম আয়োজিত এবং এসকেএফ হরমোন নিবেদিত বিশেষ এই অনলাইন আলোচনা গত শুক্রবার প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল এবং প্রথম আলো ডটকমে প্রচারিত হয়।

তাসনুভা মোহনার সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন মিনা আইভিএফ অ্যান্ড ফার্টিলিটি কেয়ারের ইনফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. নাতাশা তিলোত্তমা আলীম এবং সংগীতশিল্পী সিঁথি সাহা। আলোচনায় পিএমওএস, অনিয়মিত মাসিক, ইনফার্টিলিটি, জীবনযাপন, স্থূলতা, কিশোরীদের খাদ্যাভ্যাস ও সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অতিথিদের সঙ্গে।

পিএমওএস কী এবং সুরক্ষায় করণীয়

পিএমওএস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। ডা. নাতাশা তিলোত্তমা আলীম জানান, আগে যেটিকে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বলা হতো, সেটিকে এখন পলি এন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা পিএমওএস নামে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কারণ, এটি শুধু ওভারির সমস্যা নয়। এটি শরীরের হরমোন, মেটাবলিজম এবং ওভুলেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি জটিল অবস্থা।

ডা. নাতাশা বলেন, ‘অনেক নারী ‘‘সিস্ট’’ শব্দটি শুনেই ভয় পান এবং মনে করেন, অপারেশন লাগবে। কিন্তু পিএমওএসের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রকৃত সিস্ট থাকে না। ডিম্বস্ফুটন নিয়মিত না হওয়ায় ওভারির চারপাশে ফলিকল জমে সিস্টের মতো দেখা যায়। তাই ভয় না পেয়ে বিষয়টি সঠিকভাবে বোঝা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।’

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও ইনফার্টিলিটি

পিএমওএস হলে শরীরে এলএইচ, এফএসএইচ, থাইরয়েড, প্রোল্যাকটিন ও অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ইনসুলিনের মাত্রাও বেড়ে যায় উল্লেখ করে ডা. নাতাশা তিলোত্তমা আলীম বলেন, ‘এর ফলে ডিম্বস্ফুটন বাধাগ্রস্ত হয় এবং মাসিক অনিয়মিত হয়ে পড়ে। কারও মাসিক ৩৫ বা ৪০ দিন পর হয়, কারও এক বা দুই মাস পরপর হয়, আবার কারও দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকে। এসব লক্ষণ ভবিষ্যতে সন্তান ধারণে জটিলতা তৈরি করতে পারে।’

নাতাশা তিলোত্তমা আলীমের মতে, কোনো দম্পতি যদি এক বছর নিয়মিত অরক্ষিত যৌনসম্পর্কের পরও সন্তান ধারণ করতে না পারেন, তাহলে ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নারীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে ছয় মাস চেষ্টা করার পরই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। তবে ইনফার্টিলিটি শুধু নারীর সমস্যা নয়। স্বামী ও স্ত্রী—দুজনেরই পরীক্ষা জরুরি।

এ বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জানিয়ে কণ্ঠশিল্পী সিঁথি সাহা বলেন, ‘আমি অহরহ দেখি, আমার আশপাশে যাঁরা আছেন, অনেকের ওভুলেশন হচ্ছে না, প্রেগন্যান্ট হতে পারছেন না, তাঁদের ফার্টিলিটি কম। আমি নিজেও ছোটবেলা থেকে ওভারিয়ান সিস্টে ভুগেছি এবং চিকিৎসকের বিভিন্ন পরামর্শ নিয়েছি।’

পিএমওএস থাকলে কি মা হওয়া সম্ভব

পিএমওএস থাকলে মা হওয়া কি সম্ভব? সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. নাতাশা বলেন, ‘হ্যাঁ, সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে ডিম্বাণুর অভাব থাকে না, বরং হরমোনজনিত সমস্যার কারণে ডিম্বস্ফুটন ঠিকমতো হয় না। সঠিক চিকিৎসা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের মাধ্যমে অনেক নারীই মা হতে পারেন। শরীরের অতিরিক্ত মেদ ৫ শতাংশ কমাতে পারলে অনেকের মাসিক নিয়মিত হতে পারে এবং ১০ শতাংশ কমালে ওভুলেশন স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।’

নিজের মা হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সিঁথি সাহা বলেন, ‘আমার মা হওয়ার জার্নিটা একটু কঠিন ছিল। কারণ আমি নিজে একজন ক্যানসার সারভাইভার। আমি যখন কনসিভ করি, তখন আমার রেডিয়েশন চলছিল। সেই অবস্থায় প্রেগন্যান্ট হওয়াটা আমার কাছেও অবিশ্বাস্য ছিল। সবকিছু মিলিয়ে আমি নিজেকে খুব ব্লেসড (ভাগ্যবতী) মনে করি।’

অনলাইন আলোচনায় পিএমওএস, অনিয়মিত মাসিক, ইনফার্টিলিটি, জীবনযাপন, স্থূলতা, কিশোরীদের খাদ্যাভ্যাস এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেন ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ নাতাশা তিলোত্তমা আলীম ও সংগীতশিল্পী সিঁথি সাহা

নিজে নিজে ওষুধ খাওয়ার ঝুঁকি

আলোচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওভুলেশনের ওষুধ খাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করা হয়। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ খেলে ওভারিতে অতিরিক্ত ফলিকল তৈরি হয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হতে পারে। তাই ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে বা অন্যের পরামর্শে চিকিৎসা নেওয়া উচিত নয়।

জীবনযাপন ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য

বর্তমান কিশোরী ও তরুণীদের খাদ্যাভ্যাস নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ডা. নাতাশা জানান, ফাস্টফুড, জাঙ্ক ফুড, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব স্থূলতা বাড়ায়। স্থূলতা আবার পিএমওএস ও হরমোনজনিত সমস্যার ঝুঁকি তৈরি করে। তাই ছোটবেলা থেকেই ঘরের খাবার, নিয়মিত খেলাধুলা, পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সন্তানের খাদ্যাভ্যাসের প্রসঙ্গে সিঁথি সাহা বলেন, ‘শিশুদের খাবারের রুচি কিন্তু আমরা বড়রাই তৈরি করি। আমার সন্তানকে এখনো আমি চকলেটের স্বাদ খুব একটা বুঝতে দিইনি এবং স্ট্রিট ফুডের সঙ্গেও পরিচিত করাইনি। আমার মনে হয়, এটি খুব ভালো অভ্যাস, যদি আমরা তাদের শৈশব থেকেই তৈরি করতে পারি।’

সচেতনতা হোক লজ্জা ভাঙার প্রথম ধাপ

আমাদের দেশের নারীরা অন্য অনেক রোগের মতো ইনফার্টিলিটির সমস্যাতেও চিকিৎসকের কাছে যেতে লজ্জা, ভয় বা অবহেলা করেন। এ প্রসঙ্গে সংগীতশিল্পী সিঁথি সাহা বলেন, ‘পিরিয়ড, ওভুলেশন ও ইনফার্টিলিটির মতো বিষয় নিয়ে সমাজে এখনো সংকোচ আছে। অথচ নারীর সুস্থতার জন্য এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা জরুরি।’

আলোচনার শেষে বক্তারা বলেন, পিএমওএস বা ইনফার্টিলিটি নিয়ে ভয় বা লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসা। অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত ওজন, সন্তান ধারণে সমস্যা বা হরমোনজনিত কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সুস্থ নারী ও সমৃদ্ধ আগামীর প্রথম ধাপ।

ট্যাগঃ

অনিয়মিত মাসিক থেকে বন্ধ্যত্ব: সচেতনতাই প্রাথমিক সমাধান

সময়ঃ ১২:০৪:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

অনিয়মিত মাসিক, হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া, ব্রণ, অতিরিক্ত লোম, ডিম্বস্ফুটনের সমস্যা কিংবা সন্তান ধারণে জটিলতা—নারীর জীবনের এসব সমস্যাকে অনেক সময় লজ্জা, ভয় বা অবহেলার কারণে আড়ালেই রাখা হয়। অথচ এসব লক্ষণের পেছনে থাকতে পারে পলি এন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা ‘পিএমওএস’, যা শুধু মাসিক চক্র নয়, নারীর হরমোনের ভারসাম্য, মেটাবলিজম, ওভুলেশন এবং ভবিষ্যৎ মাতৃত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

‘সুস্থ নারী সমৃদ্ধ আগামী’ বিশেষ শীর্ষক অনলাইন আলোচনায় এ কথা উঠে আসে। জুন মাস ইনফার্টিলিটি সচেতনতার মাস। শুধু এ মাসকে কেন্দ্র করে নয়, বরং সারা বছরই নারীর প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা জরুরি। প্রথম আলো ডটকম আয়োজিত এবং এসকেএফ হরমোন নিবেদিত বিশেষ এই অনলাইন আলোচনা গত শুক্রবার প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল এবং প্রথম আলো ডটকমে প্রচারিত হয়।

তাসনুভা মোহনার সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন মিনা আইভিএফ অ্যান্ড ফার্টিলিটি কেয়ারের ইনফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. নাতাশা তিলোত্তমা আলীম এবং সংগীতশিল্পী সিঁথি সাহা। আলোচনায় পিএমওএস, অনিয়মিত মাসিক, ইনফার্টিলিটি, জীবনযাপন, স্থূলতা, কিশোরীদের খাদ্যাভ্যাস ও সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অতিথিদের সঙ্গে।

পিএমওএস কী এবং সুরক্ষায় করণীয়

পিএমওএস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। ডা. নাতাশা তিলোত্তমা আলীম জানান, আগে যেটিকে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বলা হতো, সেটিকে এখন পলি এন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম বা পিএমওএস নামে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কারণ, এটি শুধু ওভারির সমস্যা নয়। এটি শরীরের হরমোন, মেটাবলিজম এবং ওভুলেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি জটিল অবস্থা।

ডা. নাতাশা বলেন, ‘অনেক নারী ‘‘সিস্ট’’ শব্দটি শুনেই ভয় পান এবং মনে করেন, অপারেশন লাগবে। কিন্তু পিএমওএসের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রকৃত সিস্ট থাকে না। ডিম্বস্ফুটন নিয়মিত না হওয়ায় ওভারির চারপাশে ফলিকল জমে সিস্টের মতো দেখা যায়। তাই ভয় না পেয়ে বিষয়টি সঠিকভাবে বোঝা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।’

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও ইনফার্টিলিটি

পিএমওএস হলে শরীরে এলএইচ, এফএসএইচ, থাইরয়েড, প্রোল্যাকটিন ও অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ইনসুলিনের মাত্রাও বেড়ে যায় উল্লেখ করে ডা. নাতাশা তিলোত্তমা আলীম বলেন, ‘এর ফলে ডিম্বস্ফুটন বাধাগ্রস্ত হয় এবং মাসিক অনিয়মিত হয়ে পড়ে। কারও মাসিক ৩৫ বা ৪০ দিন পর হয়, কারও এক বা দুই মাস পরপর হয়, আবার কারও দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকে। এসব লক্ষণ ভবিষ্যতে সন্তান ধারণে জটিলতা তৈরি করতে পারে।’

নাতাশা তিলোত্তমা আলীমের মতে, কোনো দম্পতি যদি এক বছর নিয়মিত অরক্ষিত যৌনসম্পর্কের পরও সন্তান ধারণ করতে না পারেন, তাহলে ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নারীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে ছয় মাস চেষ্টা করার পরই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। তবে ইনফার্টিলিটি শুধু নারীর সমস্যা নয়। স্বামী ও স্ত্রী—দুজনেরই পরীক্ষা জরুরি।

এ বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জানিয়ে কণ্ঠশিল্পী সিঁথি সাহা বলেন, ‘আমি অহরহ দেখি, আমার আশপাশে যাঁরা আছেন, অনেকের ওভুলেশন হচ্ছে না, প্রেগন্যান্ট হতে পারছেন না, তাঁদের ফার্টিলিটি কম। আমি নিজেও ছোটবেলা থেকে ওভারিয়ান সিস্টে ভুগেছি এবং চিকিৎসকের বিভিন্ন পরামর্শ নিয়েছি।’

পিএমওএস থাকলে কি মা হওয়া সম্ভব

পিএমওএস থাকলে মা হওয়া কি সম্ভব? সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. নাতাশা বলেন, ‘হ্যাঁ, সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে ডিম্বাণুর অভাব থাকে না, বরং হরমোনজনিত সমস্যার কারণে ডিম্বস্ফুটন ঠিকমতো হয় না। সঠিক চিকিৎসা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের মাধ্যমে অনেক নারীই মা হতে পারেন। শরীরের অতিরিক্ত মেদ ৫ শতাংশ কমাতে পারলে অনেকের মাসিক নিয়মিত হতে পারে এবং ১০ শতাংশ কমালে ওভুলেশন স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।’

নিজের মা হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সিঁথি সাহা বলেন, ‘আমার মা হওয়ার জার্নিটা একটু কঠিন ছিল। কারণ আমি নিজে একজন ক্যানসার সারভাইভার। আমি যখন কনসিভ করি, তখন আমার রেডিয়েশন চলছিল। সেই অবস্থায় প্রেগন্যান্ট হওয়াটা আমার কাছেও অবিশ্বাস্য ছিল। সবকিছু মিলিয়ে আমি নিজেকে খুব ব্লেসড (ভাগ্যবতী) মনে করি।’

অনলাইন আলোচনায় পিএমওএস, অনিয়মিত মাসিক, ইনফার্টিলিটি, জীবনযাপন, স্থূলতা, কিশোরীদের খাদ্যাভ্যাস এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেন ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ নাতাশা তিলোত্তমা আলীম ও সংগীতশিল্পী সিঁথি সাহা

নিজে নিজে ওষুধ খাওয়ার ঝুঁকি

আলোচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওভুলেশনের ওষুধ খাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করা হয়। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ খেলে ওভারিতে অতিরিক্ত ফলিকল তৈরি হয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হতে পারে। তাই ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে বা অন্যের পরামর্শে চিকিৎসা নেওয়া উচিত নয়।

জীবনযাপন ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য

বর্তমান কিশোরী ও তরুণীদের খাদ্যাভ্যাস নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ডা. নাতাশা জানান, ফাস্টফুড, জাঙ্ক ফুড, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব স্থূলতা বাড়ায়। স্থূলতা আবার পিএমওএস ও হরমোনজনিত সমস্যার ঝুঁকি তৈরি করে। তাই ছোটবেলা থেকেই ঘরের খাবার, নিয়মিত খেলাধুলা, পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সন্তানের খাদ্যাভ্যাসের প্রসঙ্গে সিঁথি সাহা বলেন, ‘শিশুদের খাবারের রুচি কিন্তু আমরা বড়রাই তৈরি করি। আমার সন্তানকে এখনো আমি চকলেটের স্বাদ খুব একটা বুঝতে দিইনি এবং স্ট্রিট ফুডের সঙ্গেও পরিচিত করাইনি। আমার মনে হয়, এটি খুব ভালো অভ্যাস, যদি আমরা তাদের শৈশব থেকেই তৈরি করতে পারি।’

সচেতনতা হোক লজ্জা ভাঙার প্রথম ধাপ

আমাদের দেশের নারীরা অন্য অনেক রোগের মতো ইনফার্টিলিটির সমস্যাতেও চিকিৎসকের কাছে যেতে লজ্জা, ভয় বা অবহেলা করেন। এ প্রসঙ্গে সংগীতশিল্পী সিঁথি সাহা বলেন, ‘পিরিয়ড, ওভুলেশন ও ইনফার্টিলিটির মতো বিষয় নিয়ে সমাজে এখনো সংকোচ আছে। অথচ নারীর সুস্থতার জন্য এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা জরুরি।’

আলোচনার শেষে বক্তারা বলেন, পিএমওএস বা ইনফার্টিলিটি নিয়ে ভয় বা লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসা। অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত ওজন, সন্তান ধারণে সমস্যা বা হরমোনজনিত কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সুস্থ নারী ও সমৃদ্ধ আগামীর প্রথম ধাপ।