০৪:৫১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মবের শাসন: ভারতে বাড়ছে ঘৃণাজনিত অপরাধ

  • Sangbad365 Admin
  • সময়ঃ ১২:০৪:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৬০১৭ Time View

ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দি হিন্দু দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে সব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে সহিংস ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিত তুলে ধরে সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে, যেখানে বিদেশি বলতে ‘বাংলাদেশি বা চীনা’ সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। একইসঙ্গে ভারত সরকার ও সরকার চালানোর দায়িত্বে থাকা বিজেপির প্রতি ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’-এর উস্কানিমূলক প্রচারে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে দ্য হিন্দু লিখেছে, এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, ফলে পুলিশকে কঠোর হতে হবে। 

২ জানুয়ারি অনলাইনে প্রকাশিত দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয়টির অনুবাদ রাইজিংবিডি ডটকমের পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো।

২০২৫ সালের শেষ দিকে ভারতে একের পর এক সহিংস ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি ভয়ংকর প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন জায়গায় অভ্যন্তরীণ অভিবাসী শ্রমিকদের ‘বিদেশি’, বিশেষ করে ‘বাংলাদেশি’ বা ‘চীনা’ আখ্যা দিয়ে তাদের ওপর পালবদ্ধ মানুষ হামলা চালিয়েছে। অথচ এসব ঘটনায় নিহত তিনজনই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নাগরিক। 

ভাষা, অঞ্চল, চেহারা বা কথিত জাতীয়তার ভিত্তিতে সন্দেহ ক্রমেই জনরোষ ও সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পুলিশকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং রাজ্য ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে- এ ধরনের সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কেরালার পালাক্কাড জেলায় ১৭ ডিসেম্বর ছত্তিশগড়ের ৩১ বছর বয়সি অন্য রাজ্যের শ্রমিক রাম নারায়ণ বাঘেলকে জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। তাকে চুরির অভিযোগে আটক করে বারবার পরিচয় জানতে চাওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা তাকে মারধরের সময় জিজ্ঞেস করেছিল, তিনি ‘বাংলাদেশি’ কি না। 

অন্য রাজ্যের শ্রমিকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং শিক্ষা ও আইনশৃঙ্খলার জন্য সুপরিচিত কেরালার ভাবমূর্তিতে এই ঘটনা একটি গুরুতর কলঙ্ক।

২৪ ডিসেম্বর ওড়িশার সম্বলপুরে পশ্চিমবঙ্গের এক তরুণ শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। জুয়েল শেখ নামের ওই দিনমজুরকে একটি চায়ের দোকানে অজ্ঞাত কয়েকজন ব্যক্তি ঘিরে ধরে তার পরিচয়পত্র দেখাতে বলে এবং অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী বলে অভিযুক্ত করে। 

এর দুদিন পর ওড়িশাতেই আরেক ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের এক বাংলাভাষী ফুটপাতের বিক্রেতাকে মারধর করা হয়।

তামিলনাডুর তিরুভাল্লুর জেলায় ট্রেনে যাত্রাকালে ওড়িশার এক যুবকের ওপর কিশোরদের একটি দল দেশীয় অস্ত্র- মাছেটি ও কাস্তে নিয়ে হামলা চালায়। সেই হামলার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

২৮ ডিসেম্বর দেরাদুনে ত্রিপুরার ২২ বছর বয়সি ছাত্র অ্যাঞ্জেল চাকমাকে একদল ব্যক্তি ছুরিকাঘাত করে। অভিযোগ, হামলাকারীরা তাকে ও তার ভাইকে বর্ণবিদ্বেষমূলক গালিগালাজ করছিল। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের দেশের অন্য প্রান্তে প্রায়ই ‘বহিরাগত’ হিসেবে দেখা হয়; চাকমাকেও হামলাকারীরা ‘চীনা’ বলে সম্বোধন করেছিল।

এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এর পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসকদের ভয় দেখানো, এমনকি বন্ধুদের জন্মদিন উদ্‌যাপনরত তরুণদের ওপর হামলার মতো আরো মব তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছে। রাজ্য পুলিশ কিছু ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার করলেও তা যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশ থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’-এর বিরুদ্ধে উত্তেজনাকর প্রচারকে বিজেপি আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাদের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে। এর ফলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনতা নির্বিচারে অসহায় মানুষের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলতে সাহস পাচ্ছে- এটা কাকতালীয় নয়। বিজেপির উচিত এই ধরনের প্রচারের ভয়াবহ পরিণতি উপলব্ধি করা এবং সংযম দেখানো।

ট্যাগঃ

মবের শাসন: ভারতে বাড়ছে ঘৃণাজনিত অপরাধ

সময়ঃ ১২:০৪:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬

ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দি হিন্দু দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে সব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে সহিংস ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিত তুলে ধরে সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে, যেখানে বিদেশি বলতে ‘বাংলাদেশি বা চীনা’ সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। একইসঙ্গে ভারত সরকার ও সরকার চালানোর দায়িত্বে থাকা বিজেপির প্রতি ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’-এর উস্কানিমূলক প্রচারে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে দ্য হিন্দু লিখেছে, এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, ফলে পুলিশকে কঠোর হতে হবে। 

২ জানুয়ারি অনলাইনে প্রকাশিত দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয়টির অনুবাদ রাইজিংবিডি ডটকমের পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো।

২০২৫ সালের শেষ দিকে ভারতে একের পর এক সহিংস ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি ভয়ংকর প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন জায়গায় অভ্যন্তরীণ অভিবাসী শ্রমিকদের ‘বিদেশি’, বিশেষ করে ‘বাংলাদেশি’ বা ‘চীনা’ আখ্যা দিয়ে তাদের ওপর পালবদ্ধ মানুষ হামলা চালিয়েছে। অথচ এসব ঘটনায় নিহত তিনজনই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নাগরিক। 

ভাষা, অঞ্চল, চেহারা বা কথিত জাতীয়তার ভিত্তিতে সন্দেহ ক্রমেই জনরোষ ও সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পুলিশকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং রাজ্য ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে- এ ধরনের সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কেরালার পালাক্কাড জেলায় ১৭ ডিসেম্বর ছত্তিশগড়ের ৩১ বছর বয়সি অন্য রাজ্যের শ্রমিক রাম নারায়ণ বাঘেলকে জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। তাকে চুরির অভিযোগে আটক করে বারবার পরিচয় জানতে চাওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা তাকে মারধরের সময় জিজ্ঞেস করেছিল, তিনি ‘বাংলাদেশি’ কি না। 

অন্য রাজ্যের শ্রমিকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং শিক্ষা ও আইনশৃঙ্খলার জন্য সুপরিচিত কেরালার ভাবমূর্তিতে এই ঘটনা একটি গুরুতর কলঙ্ক।

২৪ ডিসেম্বর ওড়িশার সম্বলপুরে পশ্চিমবঙ্গের এক তরুণ শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। জুয়েল শেখ নামের ওই দিনমজুরকে একটি চায়ের দোকানে অজ্ঞাত কয়েকজন ব্যক্তি ঘিরে ধরে তার পরিচয়পত্র দেখাতে বলে এবং অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী বলে অভিযুক্ত করে। 

এর দুদিন পর ওড়িশাতেই আরেক ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের এক বাংলাভাষী ফুটপাতের বিক্রেতাকে মারধর করা হয়।

তামিলনাডুর তিরুভাল্লুর জেলায় ট্রেনে যাত্রাকালে ওড়িশার এক যুবকের ওপর কিশোরদের একটি দল দেশীয় অস্ত্র- মাছেটি ও কাস্তে নিয়ে হামলা চালায়। সেই হামলার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

২৮ ডিসেম্বর দেরাদুনে ত্রিপুরার ২২ বছর বয়সি ছাত্র অ্যাঞ্জেল চাকমাকে একদল ব্যক্তি ছুরিকাঘাত করে। অভিযোগ, হামলাকারীরা তাকে ও তার ভাইকে বর্ণবিদ্বেষমূলক গালিগালাজ করছিল। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের দেশের অন্য প্রান্তে প্রায়ই ‘বহিরাগত’ হিসেবে দেখা হয়; চাকমাকেও হামলাকারীরা ‘চীনা’ বলে সম্বোধন করেছিল।

এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এর পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসকদের ভয় দেখানো, এমনকি বন্ধুদের জন্মদিন উদ্‌যাপনরত তরুণদের ওপর হামলার মতো আরো মব তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছে। রাজ্য পুলিশ কিছু ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার করলেও তা যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশ থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’-এর বিরুদ্ধে উত্তেজনাকর প্রচারকে বিজেপি আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাদের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে। এর ফলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনতা নির্বিচারে অসহায় মানুষের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলতে সাহস পাচ্ছে- এটা কাকতালীয় নয়। বিজেপির উচিত এই ধরনের প্রচারের ভয়াবহ পরিণতি উপলব্ধি করা এবং সংযম দেখানো।