০৭:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সময়হীন কক্ষে

  • Sangbad365 Admin
  • সময়ঃ ১২:০১:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
  • ১৬০০১ Time View

আবার আমার সবকিছু গুলিয়ে যায়। যেন আমি এক অতল সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। একবার মাথা তুলছি আবার ডুবে যাচ্ছি। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার! আমি কি তাহলে নিজের ইচ্ছাতেই আটকে আছি এই সময়হীন কক্ষে! নাকি আমাকে কেউ আটকে রেখেছে! সে যা–ই হোক, সত্য হচ্ছে আমি একজন অবরুদ্ধ মানুষ, যার জীবন একটা চৌকোনা রুমে থমকে আছে। কত দিন ধরে জানি না। আমি বিচ্ছিন্ন বাইরের পৃথিবী থেকে, আমার সমস্ত সঙ্গ নিষেধ, দৈনন্দিন চলাচল নিষেধ, যেন আমি এক স্থবির পাথর, চলৎশক্তিহীন, নষ্ট ঘড়ির কাঁটার মতো স্থির।

‘তোমার সঙ্গে আর কারা ছিল, বলো!’

একটা দশাসই চেহারার নিষ্ঠুর অচেনা মানুষ আমার মুখের ওপর প্রায় ঝুঁকে পড়ে প্রশ্ন করে।

‘বলো, কী তাদের নাম, কী পরিচয়? কী তাদের উদ্দেশ্য? কারা তোমার সঙ্গী?’

‘আমি একজন নিঃসঙ্গ মানুষ। আমার কোনো সঙ্গী নেই, বন্ধু নেই। আমি ওই আকাশের মতো একা!’

‘একদম মিথ্যা কথা বলবি না।’

‘না, বলছি না।’

সঙ্গে সঙ্গে একটা শক্ত হাতের পাঁচটা আঙুল আমার গালে আছড়ে পড়ে। একের পর এক চপেটাঘাতে আমি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। আমার ঠোঁট কেটে রক্ত বের হয়। আমি নেতিয়ে পড়ি। মাথা ঘুরতে থাকে। পেট গুলিয়ে বমি আসতে চায়। যখন প্রায় অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা তৈরি হয়, তখন সম্ভবত ক্লান্ত হয়ে সে থামে।

হাঁপাতে হাঁপাতে আমার মনে হয়, যদি সত্যিই আমি অজ্ঞাতবাসে থাকি তবে আমার ওপর এই অত্যাচার কারা করছে, কেন করছে? কী চায় তারা? কেন এই জুলুম? আমি কি সত্যি কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত? আমি কে? কী নাম আমার?

দৃশ্যপটে আবার আবু তালেবকে দেখা যায়। তার মুখে চকচকে হাসি। সে নিজস্ব ভঙ্গিতে সেই পুরোনো প্রশ্নটিই জিজ্ঞেস করে, ‘বাথরুমে যাইবেন, স্যার?’

আমি ছটফট করে উঠি, ‘আমি বাইরে যাব। আমি এই চার দেয়ালের বাইরে যেতে চাই।’

আবু তালেব নির্বিকার কণ্ঠে বলে, ‘যান। যেখানে ইচ্ছা যান। আপনি তো মুক্ত। স্বাধীন।’

যেন পাঁচতলা থেকে ধপ করে নিচে পড়লাম—এমন একটা শূন্যতার অনুভূতি হয় আমার। হতবিহ্বল লাগে। ও কি সত্যি বলছে, নাকি আবারও আমাকে ধোঁকা দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চাইছে! এটা কি ওদের কোনো ফাঁদ? সত্যি কি আমি আবার মিনুর কাছে, আমার পরিচিত পৃথিবীর কাছে ফিরতে পারব?

আবু তালেব যেন আমার মনের প্রশ্নগুলো বুঝতে পেরে আবার বলে, ‘আপনি চাইলেই কিন্তু চলে যেতে পারেন! যেখানে মন চায় সেখানে! কেউ বাধা দেবে না। যান!’

এবার আমি একটু ধাতস্থ হয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু মনে হয় আমার পা দুটোতে কোনো জোর নেই। যেন পায়ের জায়গায় দুটো অসাড়, শক্তিহীন কাষ্ঠখণ্ড বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আতঙ্কের একটা ঢেউ আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায়। আমি হাঁচড়েপাঁচড়ে দেয়াল খামচে ধরে কোনোমতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু এরপর আর পা ফেলতে পারি না। পা দুটি যেন ভীষণ ভারী স্থবির পাথর। নিজেকে মনে হয় ডানা কেটে ফেলা এক অসহায় পাখি। ওড়ার ইচ্ছা বুকে নিয়ে মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে।

‘তোমরা আমার হাঁটার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছ!’ আমি আর্তনাদ করে উঠি।

আবু তালেব হো হো করে হাসে। চারপাশের দেয়ালে সেই হাসি প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।

ট্যাগঃ

সময়হীন কক্ষে

সময়ঃ ১২:০১:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

আবার আমার সবকিছু গুলিয়ে যায়। যেন আমি এক অতল সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। একবার মাথা তুলছি আবার ডুবে যাচ্ছি। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার! আমি কি তাহলে নিজের ইচ্ছাতেই আটকে আছি এই সময়হীন কক্ষে! নাকি আমাকে কেউ আটকে রেখেছে! সে যা–ই হোক, সত্য হচ্ছে আমি একজন অবরুদ্ধ মানুষ, যার জীবন একটা চৌকোনা রুমে থমকে আছে। কত দিন ধরে জানি না। আমি বিচ্ছিন্ন বাইরের পৃথিবী থেকে, আমার সমস্ত সঙ্গ নিষেধ, দৈনন্দিন চলাচল নিষেধ, যেন আমি এক স্থবির পাথর, চলৎশক্তিহীন, নষ্ট ঘড়ির কাঁটার মতো স্থির।

‘তোমার সঙ্গে আর কারা ছিল, বলো!’

একটা দশাসই চেহারার নিষ্ঠুর অচেনা মানুষ আমার মুখের ওপর প্রায় ঝুঁকে পড়ে প্রশ্ন করে।

‘বলো, কী তাদের নাম, কী পরিচয়? কী তাদের উদ্দেশ্য? কারা তোমার সঙ্গী?’

‘আমি একজন নিঃসঙ্গ মানুষ। আমার কোনো সঙ্গী নেই, বন্ধু নেই। আমি ওই আকাশের মতো একা!’

‘একদম মিথ্যা কথা বলবি না।’

‘না, বলছি না।’

সঙ্গে সঙ্গে একটা শক্ত হাতের পাঁচটা আঙুল আমার গালে আছড়ে পড়ে। একের পর এক চপেটাঘাতে আমি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। আমার ঠোঁট কেটে রক্ত বের হয়। আমি নেতিয়ে পড়ি। মাথা ঘুরতে থাকে। পেট গুলিয়ে বমি আসতে চায়। যখন প্রায় অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা তৈরি হয়, তখন সম্ভবত ক্লান্ত হয়ে সে থামে।

হাঁপাতে হাঁপাতে আমার মনে হয়, যদি সত্যিই আমি অজ্ঞাতবাসে থাকি তবে আমার ওপর এই অত্যাচার কারা করছে, কেন করছে? কী চায় তারা? কেন এই জুলুম? আমি কি সত্যি কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত? আমি কে? কী নাম আমার?

দৃশ্যপটে আবার আবু তালেবকে দেখা যায়। তার মুখে চকচকে হাসি। সে নিজস্ব ভঙ্গিতে সেই পুরোনো প্রশ্নটিই জিজ্ঞেস করে, ‘বাথরুমে যাইবেন, স্যার?’

আমি ছটফট করে উঠি, ‘আমি বাইরে যাব। আমি এই চার দেয়ালের বাইরে যেতে চাই।’

আবু তালেব নির্বিকার কণ্ঠে বলে, ‘যান। যেখানে ইচ্ছা যান। আপনি তো মুক্ত। স্বাধীন।’

যেন পাঁচতলা থেকে ধপ করে নিচে পড়লাম—এমন একটা শূন্যতার অনুভূতি হয় আমার। হতবিহ্বল লাগে। ও কি সত্যি বলছে, নাকি আবারও আমাকে ধোঁকা দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চাইছে! এটা কি ওদের কোনো ফাঁদ? সত্যি কি আমি আবার মিনুর কাছে, আমার পরিচিত পৃথিবীর কাছে ফিরতে পারব?

আবু তালেব যেন আমার মনের প্রশ্নগুলো বুঝতে পেরে আবার বলে, ‘আপনি চাইলেই কিন্তু চলে যেতে পারেন! যেখানে মন চায় সেখানে! কেউ বাধা দেবে না। যান!’

এবার আমি একটু ধাতস্থ হয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু মনে হয় আমার পা দুটোতে কোনো জোর নেই। যেন পায়ের জায়গায় দুটো অসাড়, শক্তিহীন কাষ্ঠখণ্ড বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আতঙ্কের একটা ঢেউ আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায়। আমি হাঁচড়েপাঁচড়ে দেয়াল খামচে ধরে কোনোমতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু এরপর আর পা ফেলতে পারি না। পা দুটি যেন ভীষণ ভারী স্থবির পাথর। নিজেকে মনে হয় ডানা কেটে ফেলা এক অসহায় পাখি। ওড়ার ইচ্ছা বুকে নিয়ে মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে।

‘তোমরা আমার হাঁটার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছ!’ আমি আর্তনাদ করে উঠি।

আবু তালেব হো হো করে হাসে। চারপাশের দেয়ালে সেই হাসি প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।