সুনামগঞ্জে প্রতারক চক্র তরুণদের যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যেতে দালালদের শরণাপন্ন হচ্ছেন অনেক যুবক। ভিটে-মাটি বিক্রি করে এবং ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে টাকা তুলে দিচ্ছেন দালালদের হাতে। শেষ পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ ঋণের বোঝা বইতে না পেয়ে বাড়িছাড়া হয়েছেন।
দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। একইসঙ্গে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার অনেকে প্রবাসে থাকেন। প্রায় প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ ইউরোপ-আমেরিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত। এখানকার প্রায় সব তরুণের একটাই স্বপ্ন— যেভাবেই হোক বিদেশে যেতে হবে। সেই স্বপ্নকেই পুঁজি করে দালাল চক্র চালাচ্ছে প্রতারণার কালো বাণিজ্য।
জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের যুবক কামরুল মিয়া। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল তার। কিন্তু, আরো উন্নত জীবনের আশায় প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্ন তাকে ঠেলে দেয় ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে।
তানভীর আহমেদ খান নামে জগন্নাথপুর উপজেলার চিহ্নিত এক দালালের আশ্বাসে ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে শ্রম ভিসায় যুক্তরাজ্যে যেতে উদ্যোগী হন কামরুল মিয়া। তিনি বিক্রি করেন নিজের জমি, এমনকি মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয় বসতভিটাও। চুক্তি অনুযাযী গত বছরের অক্টোবর মাসে কয়েক দফায় তানভীরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সাড়ে ১৮ লাখ টাকা এবং হাতে নগদ সাড়ে ৬ লাখ টাকা তুলে দেন কামরুল মিয়া। টাকা নেওয়ার পর তানভীর তাকে ভিসা, বিমানের টিকিটসহ সব কাগজপত্র বুঝিয়ে দেয়, যা ছিল সাজানো নাটক।
যুক্তরাজ্যে যাত্রার তারিখ বলা হয় ২৪ অক্টোবর। তবে, সেদিন বিমানবন্দরে পৌঁছে জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা খান কামরুল। ইমিগ্রেশন পুলিশ কাগজপত্র যাচাই করে জানায়, সব কিছুই জাল। এতে ভেঙে যায় তার ইউরোপ যাত্রার স্বপ্ন। এর পরে বহুবার নানাভাবে চেষ্টা করেও আর তানভীরকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। দালালের প্রতারণায় একদিকে প্রবাসের স্বপ্ন ভঙ্গ, অন্যদিকে এনজিও থেকে নেওয়া ঋণ ও দেনায় জর্জরিত হয়ে দিশেহারা তার পরিবার।
মো.কামরুল মিয়া রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেছেন, “দালাল তানভীর খান আমাকে বলছিল, সে আমাকে লন্ডন পাঠাতে পারবে। সে অনেক মানুষকে এভাবে বিদেশে পাঠিয়েছে, এ দাবি করত। আমাকে প্রায়ই বলত, তুই দেশে কেন? তুই আমার ধারে আসিস, আমি তোকে লন্ডন পাঠিয়ে দেবো। সে যেসব কাগজপত্র চেয়েছে, আমি তাকে সব পাঠিয়েছি। কিছুদিন পর আমাকে একটা কাগজ দেখিয়ে বলে, তোর ভিসা হয়েছে। তুই এখন টাকা দে। এর পর আমি তানভীরের ব্যাংকে সাড়ে ১৮ লাখ ও হাতে নগদ সাড়ে ৬ লাখ, মোট ২৫ লাখ টাকা দিলাম। পরে আমার টাকাগুলো মাইর গেলো।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “তানভীরের দেওয়া কাগজপত্র নিয়ে যখন আমি বিমানবন্দরে গেলাম, আমাকে পুলিশ জানায়, এসব ফেইক (জাল)। গ্রামের বিচারকদের জানানোর পর, তারা বসেও এখন পর্যন্ত আমার টাকাগুলো উদ্ধার করে দিতে পারেননি।”
কামরুল আরো বলেন, “আমি লন্ডনে যাওয়ার আশায়, বিভিন্ন এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছি। পরে নিজের জায়গা-জমি, এমনকি আমার ঘরটাও বিক্রি করে দিলাম। এখন আমি একেবারেই পথে বসে গেছি। আমি ব্যাংক ও এনজিওর ঋণের চাপে বাড়িছাড়া। এখন আমাকে সরকার সহযোগিতা না করলে আমার টাকাগুলো উদ্ধার করতে পারব না। আমি প্রসাশনের সহযোগিতা চাই।”
কামরুলের স্ত্রী রচনা বেগম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমরা খুবই সুখী পরিবার ছিলাম। কিন্তু, দালাল তানভীরের কথায় ঋণ করে আর বাড়ি-ঘর বিক্রি করে আজ আমরা রাস্তার ফকিরের মতো হয়ে গেছি। আমরা এর বিচার চাই।”
কামরুলের মতোই দালালদের চক্রের খপ্পড়ে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে আরো অনেকে। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তানভীর খান, তার চাচাতো ভাই মুহিব উদ্দিন খান, মালেক খানসহ একটি চক্র সিলেট শহরে ট্রাভেল এজেন্সি খুলেছে। তারা এলাকার যুবকদের প্রলোভন দেখিয়ে যুক্তরাজ্যের শ্রম ভিসার নামে জাল কাগজপত্র দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।
এমনই আরেকজন ভুক্তভোগী একই উপজেলার সিরাজ আলী। তিনি তার ছেলে, ছেলের বউকে প্রবাসে পাঠাতে গিয়ে ৩৬ লাখ টাকা খুইয়েছেন।
ভুক্তভোগী সিরাজ আলী এ প্রতিবেদককে বলেছেন, “কয়েকজন মিলে একটা চক্র আছে। তারা ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে প্রবাসে নেওয়ার নানা সুযোগ-সুবিধার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আমি তাকে ৩৬ লাখ টাকা দিছিলাম যে, আমার ছেলে ও ছেলের বউকে লন্ডনে পাঠাবে। কিন্তু, সে আমার টাকাগুলো মেরে খেয়েছে। এখন আমি অসহায় হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি।”
তিনি বলেন, “আমি গ্রামের বিচারকদেরকে জানিয়েছিলাম। তারা বিচার করলেন। সে আমাকে টাকা ফিরত দিবে বলে জানায়। পরে আমাকে দুইটা চেক দিয়েছে। আমি নিয়ে দেখি, এগুলো জাল চেক। অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। আমি এর পর আবারও বিচারকদের কাছে গেলাম, কিন্তু কাজ হয়নি। অবশেষে আমি আর্মির কাছে গেলাম। তারাও বিচার করে দেবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ৩৬ লাখ টাকা পাইনি।”
এলাকাবাসী জানিয়েছেন, প্রভাবশালী এই দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে অপরাধের স্বর্গরাজ্য গড়ে তুললেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রতারণার শিকার পরিবারগুলোর টাকা ফেরত দেওয়া দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় মোহাম্মদ রফু মিয়া রাইজিংবিডিকে বলেছেন, “আমাদের পাশের ইউনিয়নের যুবক তানভীর খান ট্রাভেলসের ব্যবসা করে। সে এলাকার ছোট ভাই কামরুলকে বিদেশে নেওয়ার কথা বলে প্রতারণা করেছে। আমি অনুরোধ করব, পুলিশ যেন তাকে আইনের আওতায় আনে।”
সৌরভ বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তি বলেন, “আমাদের গ্রামের ভাই কামরুলকে লন্ডনে পাঠাবে বলে ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে তানভীর। কামরুল এখন একেবারেই নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তিনি তিনটা লোন তুলেছিলেন। এখন মাস হলেই এনজিও ও ব্যাংকের কর্মকর্তারা তাকে তাড়া দেয়, নানা চাপ দেয়। তখন তিনি আমাদের কাছে টাকা-পয়সা খোঁজেন। কোনো সময় টাকা পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করতে পারি আবার কোনো সময় পারি না।”
এ বিষয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত তানভীরের বাড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে এ প্রতিবেদককে মামলার হুমকি দেন তিনি।
তানভীর খান বলেন, “আপনারা আমার মানহানি করার জন্য লেগেছেন। আমি আপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থায় যাচ্ছি।”
প্রতারণার ঘটনায় অভিযুক্ত তানভীর খানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন প্রতারণার শিকার কামরুল মিয়া।
দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেছেন, “এই যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, এজেন্সিগুলো আছে, তাদের কাজকর্মে সমস্যা আছে। এটার জন্য প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় আছে, তাদের সাথে আমরা যোগাযোগ করব। লাইসেন্সেরও তো একটা ব্যাপার আছে। আমরা তদন্ত করে দেখব, কে জড়িত? তখন সবকিছুই বেরিয়ে আসবে। এসব মামলা আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে দেখব।”
Sangbad365 Admin 







