বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল এখন দ্বিমুখী বৈষম্যের শিকার। একদিকে জাতীয় জ্বালানিসংকটজনিত লোডশেডিং অব্যাহত রেখে বিদ্যুৎ–বৈষম্য করা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোকে অবহেলা করে কাঠামোগতভাবে বৈষম্য জিইয়ে রাখা হচ্ছে। লিখেছেন মোশাহিদা সুলতানা
কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের বিদ্যুৎ–চিত্রে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। সরকারি মুখপাত্ররা বলছেন, লোডশেডিং নেই বা থাকলেও তা নগণ্য। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, বড় পরিসরে লোডশেডিং হচ্ছে এবং তার অধিকাংশই হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। কোথাও কোথাও গ্রাহকেরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন। এই পরস্পরবিরোধী তথ্যের মাঝে প্রশ্ন উঠছে—নীতিনির্ধারকেরা কেন জনসমক্ষে গ্রামের লোডশেডিংয়ের বিষয়টি অস্বীকার করছেন? কেন লোডশেডিংয়ের চাপ নিতে হচ্ছে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকদের? আর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিই বা কী করে সামাল দিচ্ছে এই অবস্থা?
সম্প্রতি ক্রমাগত নানামুখী বৈষম্যের শিকার হয়ে পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা একটি অভূতপূর্ব শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছেন। ১৪ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে অতিরিক্ত কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন সমিতির প্রায় ৪৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁরা জানিয়েছেন, এতে জাতীয় সেবায় অতিরিক্ত প্রায় ৭ লাখ ৮২ হাজার কর্মঘণ্টা যুক্ত হবে। এ কর্মসূচি কর্মঘণ্টা বাড়িয়ে গ্রামীণ বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বকেয়া আদায়ে সহায়তা করবে; কিন্তু একই সঙ্গে এটি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যকার কাঠামোগত বৈষম্যেরও প্রতিবাদ।
২.
বাংলাদেশে এখন চাহিদার তুলনায় কার্যকর উৎপাদন প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বা তার চেয়ে কম। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত কয়েক দিনে গড়ে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল তিন হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে এক রাতে সর্বোচ্চ লোডশেডিং নথিভুক্ত হয়েছে ৩ হাজার ২৭৫ মেগাওয়াট; আর পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) নিজস্ব হিসাবে ওই রাতে আরইবির লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ লোডশেডিংয়ের ৮৪ শতাংশই হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে কেন এই বৈষম্য?
শুধু ঘাটতি নয়; ঘাটতির কারণগুলোও সংখ্যায় ও প্রতিবেদনে স্পষ্ট। পিডিবির বকেয়া প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। পিডিবি চুক্তিভিত্তিকভাবে কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনে, কিন্তু বকেয়া থাকায় কেন্দ্রগুলো নিয়মিত উৎপাদন চালাতে পারছে না। প্রয়োজনীয় কয়লা ক্রয় করতে না পারায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা পাওনা থাকার কারণে ৬০০ মেগাওয়াট ও রামপালে কারিগরি ত্রুটির কারণে আরও ৬০০ মেগাওয়াট কমেছে। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ৪৫০ মেগাওয়াট হলেও গড় উৎপাদন হয় মাত্র ৩৫ মেগাওয়াট। তেলচালিত কেন্দ্রগুলো মোট সক্ষমতার এক–চতুর্থাংশ সরবরাহ করছে। এসব কেন্দ্রের পাওনা প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এ থেকে উৎপাদন-ব্যর্থতা ও আর্থিক সামর্থ্যের চিত্র বোঝা যায়।
এই জাতীয় স্তরের ঘাটতি ও আর্থিক জটিলতার ভুক্তভোগীরা প্রধানত গ্রামাঞ্চলের মানুষ। তাই শহরে যাঁরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন, তাঁরা এই অভিঘাত অনুভবই করতে পারছেন না। দেশে সরবরাহকৃত মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫৭ শতাংশ গ্রামীণ অঞ্চলে পল্লী বিদ্যুতের মাধ্যমে যায়। এ কারণে উৎপাদন বা জ্বালানিসংকট হলে প্রথমেই এই অভিঘাত এসে পড়ে গ্রামের মানুষের ওপর।
গ্রামের কাহিনি হৃদয়বিদারক। কোথাও দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই; নেত্রকোনার এক গ্রাহক বলছেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না; ময়মনসিংহে রাতে চাহিদা ছিল ৮৭ মেগাওয়াট, সরবরাহ পেয়েছিল ৪৮ মেগাওয়াট; দিনাজপুরে যেখানে চাহিদা ৩৩ মেগাওয়াট, সরবরাহ হচ্ছে ১৮–২০ মেগাওয়াট। এসব আলাদা আলাদা ঘটনা একত্র করলে বোঝা যায়, গ্রামে গ্রামে চাহিদার অর্ধেকও না পাওয়া এক অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এখানেই আবির্ভূত হয় আরেকটি সমস্যা—দায় চাপানো। ক্রমেই দেখা যায়, লোডশেডিং ও গ্রাহক অসন্তোষের দায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ওপর চাপানো হয়। সম্প্রতি বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিসের সামনে অসন্তোষ ও হামলার খবর এসেছে; নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি চাইলেই যেন গ্রাহকদের অনুরোধে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে! আর অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের কথায় মনে হয়, বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণ শুধুই পল্লী বিদ্যুতের ভঙ্গুর অবকাঠামো! এই অবকাঠামোগত দুর্বলতার জন্য যেন কেউ দায়ী নয়! সামান্য বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য তাদের যেন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নেই!
কিন্তু লোডশেডিংয়ের মূল কারণ হলো কেন্দ্রীয় উৎপাদনভিত্তিক সংকট, বকেয়া বিল এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া। আর ভঙ্গুর অবকাঠামোর দায় আসলে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের। তাদের ক্রয় করা নিম্নমানের সরঞ্জাম, অবকাঠামো নির্মাণে নকশার দুর্বলতা এবং সর্বোপরি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটি শোষণমূলক কাঠামোকে জিইয়ে রেখে, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড নিজেই বিদ্যুৎ–সংকট নিরসনে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩.
১৯৭৮ সালে আমেরিকান রুরাল মডেল (এনআরইসিএ) অনুসরণে গঠিত একটি বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার অধীনে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, সরঞ্জাম সরবরাহ, তদারকি ও রেগুলেটরি ভূমিকা পালন করে এবং পিডিবি থেকে বিদ্যুৎ কিনে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর মাধ্যমে গ্রাহকদের পৌঁছে দেয়। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো নতুন সংযোগ, সরবরাহ, বিল সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে। কিন্তু বাস্তবে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক হওয়ায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে নীতিনির্ধারণ, ক্রয় ও মান নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুতেই পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আধিপত্য থাকে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর কর্মক্ষমতা দুর্বল হয়। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যা, যেমন পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড কর্তৃক সৃষ্ট জনবলসংকট, প্রয়োজনীয় মালামালের বরাদ্দ না দেওয়া, নিম্নমানের মালামাল সরবরাহের কারণে সেগুলো বারবার নষ্ট হওয়া এবং ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিতরণ সিস্টেম ডিজাইন না করা ইত্যাদি বোঝার জন্য মাঠপর্যায়ে বিতরণব্যবস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। কিন্তু পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড মাঠপর্যায়ে বিতরণ সিস্টেমের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকায় সীমাবদ্ধগুলোর বিষয়ে উদাসীন। ফলে গ্রাহক অসন্তোষ বেশি ও সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং এতে বলির পাঁঠা হচ্ছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির হাজার হাজার কর্মী মাঠে রাস্তায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যুতের লাইন মেরামত করেন। তাঁদের জন্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও মানসম্মত মালামাল দেওয়ার কথা থাকলেও, এসব ক্রয় ও সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের হাতেই সীমাবদ্ধ। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বোর্ডের নিম্নমানের মালামাল সরবরাহের কারণে প্রায় ৬৮ শতাংশ বিদ্যুৎ–বিভ্রাট ঘটে। যার ভুক্তভোগী গ্রামীণ মানুষ এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। কিন্তু সমস্যা ঘটলে মাঠের কর্মীদেরই দায় নিতে হয়; পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড তদন্ত করে, শাস্তি হয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মীদের।
পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও বদলির ঝুঁকি, মানহানির ভয়, আর দুর্ঘটনায় মারা গেলে ক্ষতিপূরণ ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। প্রায়ই কর্মরত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে লাইনম্যানদের নিহত হওয়ার খবর আসে। সিস্টেমের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৮৭ জন নিহত ও ১ হাজার ৯৫১ জন আহত বা অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন। শুধু তা–ই নয়, বিদ্যুতায়িত হয়ে সাধারণ মানুষও নিহত হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিন মাসে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কমপক্ষে ১০ গ্রামবাসীর মারা যাওয়ার খবর নিয়ে সংসদে আলোচনা হলেও কোনো সহমর্মিতা বা যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি; বরং কিছু বক্তব্য এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যেন এ ধরনের মৃত্যু নিয়ে উপহাস করাই যায়। এমন উপহাস গ্রামীণ গ্রাহক ও পল্লী বিদ্যুৎ কর্মীদের প্রতি অবহেলার প্রতিফলন। আর এই অবহেলার জবাবে এই অভিনব প্রতিবাদ।
৪.
২০২৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে পল্লী বিদ্যুৎ কর্মীরা দ্বৈত ব্যবস্থার অবসান এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও সমিতির একীভূতকরণের দাবি জানিয়ে আসছেন। বোর্ডের স্বেচ্ছাচারী আচরণ, মনগড়া নীতিমালা ও নির্বিচার শাস্তি পিবিএস কর্মীদের কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সমিতির কর্মীরা এর আগে বহুবার স্মারকলিপি, গণস্বাক্ষর ও কর্মবিরতি করে সমস্যার সমাধান দাবি করেছেন; ৪০ হাজারের অধিক কর্মী কর্মসূচিগুলোতে অংশগ্রহণ করেছেন। সরকার কমিটি গঠন এবং সময় নেওয়ার পরও বাস্তবে অগ্রগতি দেখা যায়নি; বরং কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা, হামলা ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৪ জনকে নোটিশ ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।
এসব নির্বিচার প্রতিক্রিয়ার জেরে বিভিন্ন সমিতিতে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক সেবা প্রদানে বাধা সৃষ্টি করছিল। প্রতিবাদের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষের দিকে এসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় ৪৬ জন চাকরিচ্যুত কর্মীকে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়। কিন্তু পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড সেই নির্দেশ মানেনি। এখনো চাকরিচ্যুত কর্মীরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এ ধরনের বৈষম্য পল্লী বিদ্যুৎ কর্মীদের এই অভূতপূর্ব প্রতিবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
দ্বৈত ব্যবস্থার অভিযোগ নতুন নয়। বিশ্বব্যাংক, এসমেক ২০০৫, ২০০৯, ২০১০—প্রতিবেদনগুলোতে বারবার সুপারিশ এসেছে আরইবির নিয়ন্ত্রণ সীমিত করে পিবিএসগুলোকে শক্তিশালী করা ও অঞ্চলভিত্তিক বিতরণ সিস্টেম যেন গড়ে তোলা হয়। ২০২৪–২৫ সালে সমিতির কর্মীদের একাধিকবার আন্দোলন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় কমিটি গঠনের পরও কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় তাঁরা হতাশ হয়ে পড়েন। লাইনম্যানদের ব্যাপক বদলি, নির্বিচার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও মামলা—এসব পিবিএসের সক্ষমতাকে বরং ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
যাঁরা গ্রামাঞ্চলে সরাসরি সেবা দিচ্ছেন, বিতরণব্যবস্থায় সরাসরি কাজ করছেন, তাঁদের কথা উপেক্ষা করে কি আধুনিক বিতরণব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব? আমরা প্রায়ই শুনি ফল্টের কারণে বিদ্যুৎ–বিভ্রাট হচ্ছে; যা আসলে লোডশেডিং নয়। এই ফল্ট কি নিম্নমানের সরঞ্জামের ফলাফল নয়? এই বিষয়গুলোকে কেন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না? পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মীদের কথা কেন শোনা হচ্ছে না?
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি কমিটি গঠন করে সুপারিশমালা প্রদান করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি এবং কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) একীভূতকরণের একটি প্রস্তাবনা দিয়েছিল। কিন্তু কোনো সুপারিশই আলোর মুখ দেখেনি। নতুন সরকার আসার পর এই নিয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি; বরং আমরা দেখলাম পল্লী বিদ্যুতের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রসঙ্গ এলেই বিষয়টিকে অন্যদিকে ধাবিত করার কৌশল নেওয়া হয়। এই ব্যবস্থা একীভূত হলে আরইবির জনবলের পূর্ণ ব্যবহার হবে, সংকট কমবে, সরকারি ব্যয় হ্রাস পাবে। উপরন্তু দায় এড়ানোর সুযোগ না থাকায় একটি আবহাওয়া–সহনশীল বিতরণব্যবস্থা গড়ে উঠবে এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সেবার মান বৃদ্ধি পাবে।
৫.
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল এখন দ্বিমুখী বৈষম্যের শিকার। একদিকে জাতীয় জ্বালানিসংকটজনিত লোডশেডিং অব্যাহত রেখে বিদ্যুৎ–বৈষম্য করা হচ্ছে; অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোকে অবহেলা করে কাঠামোগতভাবে বৈষম্য জিইয়ে রাখা হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ের সংকট অস্বীকার করতে গিয়ে নীতিনির্ধারকেরা অবকাঠামোগত সংকটকে সামনে হাজির করছেন। অথচ দায় কার, কীভাবে এই সংকট নিরসন করা যায় এবং বিদ্যুৎ–বৈষম্য থেকে মুক্তি ঘটানো যায়, তা রয়ে যাচ্ছে আলোচনার বাইরে।
নতুন সরকারের উচিত ছিল অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল করার উদ্যোগ নেওয়া; পুনর্বহালসহ অন্যান্য সরকারি নির্দেশ কেন পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড অমান্য করেছে তার জবাবদিহি চাওয়া; এই ব্যবস্থায় কেন এত বড় সংকট তৈরি হলো তা খুঁজে বের করে সমাধান করা। তা না করে যাঁরা শোষণের শিকার, সরকার যদি উল্টো তাঁদের প্রতি অসহযোগী হয়, তাহলে মানুষের কাছে বার্তা যায় যে এই সরকার বিদ্যমান ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন চায় না। এর পরিণতি হবে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ।
-
ড. মোশাহিদা সুলতানা জ্বালানি গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক, অ্যাকাউন্টিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
-
মতামত লেখকের নিজস্ব
Sangbad365 Admin 
