০৮:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিজিটাল যুগে একজন ডাককর্মীর কান্না এবং…

  • Sangbad365 Admin
  • সময়ঃ ১২:০৪:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
  • ১৬০০২ Time View

একজন ডাক বিভাগের কর্মচারী ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন, তিনি মাসে মাত্র ৪ হাজার ৪৬০ টাকা বেতন পান। দিনে হিসাব করলে প্রায় ১৪৬ টাকা। এই টাকায় সংসার চলে না। সন্তানদের পড়াশোনা চালাতে হয়েছে ধার করে। কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।

এটি শুধু একজন নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীর ব্যক্তিগত কান্না নয়। এটি রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের অদক্ষ ব্যবহার, নীতিগত অবহেলা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। একজন কর্মচারীর চোখের পানি আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন তুলে ধরে, এত বিস্তৃত অবকাঠামো, এত পুরোনো প্রতিষ্ঠান, এত জনবল থাকার পরও বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কেন আজও দেশের ই-কমার্স, লজিস্টিকস ও ডিজিটাল সেবার কেন্দ্রে নেই?

প্রশ্নটি মানবিক, কিন্তু একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী। এই মানুষেরা কি কাজ করতে চান না? তাঁরা কি দায়িত্ব পালন করেন না? নাকি আমরা তাঁদের কাজকে সময়োপযোগী, আয়সৃষ্টিকারী ও মর্যাদাপূর্ণ করার মতো ব্যবস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি?

বাংলাদেশ ডাক বিভাগ একসময় মানুষের যোগাযোগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান ছিল। চিঠি, মানি অর্ডার, ভিপিপি, পার্সেল, সঞ্চয়পত্র, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক, সরকারি বার্তা, চাকরির নিয়োগপত্র, পরীক্ষার প্রবেশপত্র, আদালতের নোটিশ, বিদেশে থাকা আত্মীয়ের খবর—সবকিছুর সঙ্গে ডাক বিভাগের সম্পর্ক ছিল। ডাকপিয়ন শুধু সরকারি কর্মচারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানুষের অপেক্ষা, আনন্দ, দুঃখ ও সংবাদ বহনের এক মানবিক চরিত্র।

কিন্তু সময় বদলেছে। চিঠির জায়গা নিয়েছে মোবাইল ফোন, ই-মেইল ও মেসেঞ্জার। মানি অর্ডারের জায়গা নিয়েছে মোবাইলে আর্থিক সেবা। খবরের কাগজের অপেক্ষা কমেছে, মানুষ ফোনের পর্দায় খবর পড়ে। এই পরিবর্তন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু যোগাযোগের পুরোনো ধরন বদলে গেছে বলে ডাক বিভাগের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে, এমন ধারণা ভুল। বরং ই-কমার্স, পার্সেল ডেলিভারি, লাস্ট-মাইল লজিস্টিকস, ক্যাশ অন ডেলিভারি, রিটার্ন ম্যানেজমেন্ট, গ্রামীণ উদ্যোক্তা এবং ক্রস-বর্ডার বাণিজ্যের যুগে ডাক বিভাগের প্রয়োজন আরও বেড়ে যাওয়ার কথা ছিল।

বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার বিস্তৃত অবকাঠামো ও জনবল। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ডাকঘর, ডাককর্মী ও পরিচিত সেবাব্যবস্থার উপস্থিতি আছে। একটি বেসরকারি কুরিয়ার কোম্পানিকে যে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে বছরের পর বছর বিনিয়োগ করতে হয়, ডাক বিভাগের হাতে তার ঐতিহাসিক ভিত্তি আগে থেকেই ছিল। অথচ সেই শক্তিকে সময়োপযোগী করা যায়নি। ফলে একদিকে ডাক বিভাগের কর্মচারীরা অমানবিকভাবে কম আয়ে জীবন চালাতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশের দ্রুতবর্ধনশীল ই-কমার্স ও লজিস্টিকস বাজারে ডাক বিভাগের অংশগ্রহণ সীমিত থেকে যাচ্ছে।

এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেদনাদায়ক। একই সময়ে আরইডিএক্স, স্টিডফাস্ট, পাঠাও, সুন্দরবনসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম অবকাঠামো দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর পিকআপ, ট্র্যাকিং, ক্যাশ অন ডেলিভারি, মার্চেন্ট পেমেন্ট, রিটার্ন সার্ভিস এবং লাস্ট-মাইল ডেলিভারি ব্যবস্থা তৈরি করেছে। প্রতিদিন লাখ লাখ পণ্য দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে। শহরের তরুণ উদ্যোক্তা, অনলাইন ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ফেসবুকভিত্তিক নারী উদ্যোক্তা, গ্রামীণ উৎপাদক—সবাই কোনো না কোনোভাবে এই নতুন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সফলতাকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং তারা প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশে কার্যকর লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব। সঠিক প্রযুক্তি, দ্রুত সিদ্ধান্ত, গ্রাহকসেবা, ট্র্যাকিং, লেনদেন সমন্বয় এবং জবাবদিহি থাকলে মানুষ সেবা নেয়, উদ্যোক্তারা যুক্ত হয়, বাজার তৈরি হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই কাজের জন্য সবচেয়ে বড় সামাজিক ও ভৌগোলিক নেটওয়ার্কটি তো আগে থেকেই ডাক বিভাগের হাতে ছিল। তাহলে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান কেন সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারল না?

সমস্যা শুধু প্রযুক্তির নয়। প্রযুক্তি কেনা যায়, সফটওয়্যার বানানো যায়, অ্যাপ তৈরি করা যায়। আসল সমস্যা হলো ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহি ও প্রণোদনা–কাঠামোর দুর্বলতা। ভালো উদ্যোগ অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সিদ্ধান্তহীনতা, অস্বচ্ছতা, ব্যক্তিস্বার্থ, ঝুঁকি না নেওয়ার প্রবণতা এবং কার্যকর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের অভাবে আটকে যায়। যাঁরা অভিজ্ঞতা, সময়, অর্থ ও উদ্ভাবনী চিন্তা নিয়ে একটি ইকোসিস্টেম গড়তে চান, তাঁরা বারবার দরজায় কড়া নাড়েন, প্রস্তাব দেন, পাইলট প্রকল্প করতে চান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে সরে যেতে বাধ্য হন।

আজ যে ডাককর্মী ধার করে সন্তানকে লেখাপড়া করাচ্ছেন, তাঁর দায় শুধু কম বেতনের নয়। দায় এমন একটি ব্যবস্থার, যে ব্যবস্থা তাঁর শ্রমকে উৎপাদনশীল ও আয় সৃষ্টিকারী কাজে ব্যবহার করতে পারেনি। একজন কর্মচারী যদি কাজ করতে চান, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের কাঠামো তাঁকে নতুন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে না পারে, তাহলে সেটি কর্মচারীর ব্যর্থতা নয়, সেটি নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা। রাষ্ট্র তাঁকে নিয়োগ দিয়েছে, কিন্তু তাঁর কর্মক্ষেত্রকে আধুনিক করেনি। তাঁর দক্ষতা বাড়ায়নি। তাঁর শ্রমের বাজারমূল্য তৈরি করেনি।

অবশ্যই ডাক বিভাগের কর্মচারীদের ন্যায্য ও সম্মানজনক বেতন দিতে হবে। মাসে কয়েক হাজার টাকায় একজন মানুষ কীভাবে পরিবার চালাবেন, সন্তান পড়াবেন, চিকিৎসা করবেন, সামাজিক মর্যাদা রাখবেন? এই প্রশ্ন মানবিক, নৈতিক ও প্রশাসনিক। কিন্তু শুধু সরকারি বাজেট থেকে বেতন বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। কারণ, আয়হীন প্রতিষ্ঠানকে কেবল ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায়, শক্তিশালী করা যায় না। ডাক বিভাগকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও রাজস্ব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে।

নীতিনির্ধারকদের এখন স্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ডাক বিভাগ কি শুধু অতীতের স্মৃতিবাহী একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে, নাকি এটি ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জাতীয় অবকাঠামোতে পরিণত হবে?

প্রতিটি ডাকঘর হতে পারে ই-কমার্স পণ্য গ্রহণ ও বিতরণকেন্দ্র। প্রতিটি ডাকঘর হতে পারে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের লজিস্টিকস হাব। প্রতিটি ডাকঘর হতে পারে ক্যাশ অন ডেলিভারি ও ডিজিটাল পেমেন্ট পয়েন্ট। প্রতিটি ডাকঘর হতে পারে রিটার্ন ও এক্সচেঞ্জ সেন্টার। প্রতিটি ডাকঘর হতে পারে আন্তর্জাতিক ও ক্রস-বর্ডার পার্সেল পাঠানোর কেন্দ্র। যেসব গ্রামে এখনো ভালো কুরিয়ার সেবা নেই, সেখানে ডাক বিভাগ সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। চরাঞ্চল, হাওর, পাহাড়, উপকূল, সীমান্ত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য এটি হতে পারে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাণিজ্যের অবকাঠামো।

এর জন্য সরকারকে সবকিছু নিজে পরিচালনা করতে হবে না। আবার সবকিছু বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলেই সমাধান হবে, এমন সরল ধারণাও বিপজ্জনক। দরকার স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব। দক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম এবং আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু নীতি, তথ্য, মানদণ্ড, গ্রাহক সুরক্ষা, কর্মচারীর অধিকার এবং রাজস্ব ভাগাভাগির ওপর রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারি থাকতে হবে।

ডিজিটাল রূপান্তরের মূল উপাদানগুলো হতে পারে তাৎক্ষণিক ট্র্যাকিং, নির্দিষ্ট ডেলিভারি সময়সীমা, ডিজিটাল রসিদ, গ্রাহক অভিযোগ নিষ্পত্তি, ক্যাশ অন ডেলিভারি ব্যবস্থাপনা, মার্চেন্ট পেমেন্ট, রিটার্ন ও এক্সচেঞ্জ সেবা, আন্তর্জাতিক পার্সেল ট্র্যাকিং, ডেটা সুরক্ষা, সেবা মানের সূচক এবং স্বাধীন নিরীক্ষা। শুধু অ্যাপ বানালেই ডিজিটালাইজেশন হয় না। ডিজিটালাইজেশন মানে হলো সেবা দ্রুত, স্বচ্ছ, পরিমাপযোগ্য, দায়বদ্ধ ও গ্রাহকবান্ধব হওয়া।

ডাক বিভাগের কর্মচারীদেরও নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করতে হবে। তাঁরা শুধু চিঠি বিলি করবেন না, তাঁরা হবেন ডিজিটাল লজিস্টিকস সহায়ক, গ্রামীণ ই-কমার্স সেবা প্রদানকারী, পার্সেল ম্যানেজার, পেমেন্ট সহায়ক ও গ্রাহকসেবা কর্মী। তাঁদের হাতে মোবাইল ফোন থাকবে, অ্যাপ থাকবে, ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকবে, ডিজিটাল রসিদ থাকবে। কর্মচারীর আয় শুধু বেতনে সীমাবদ্ধ না রেখে সেবাভিত্তিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠান আয় করবে, কর্মচারীরাও সম্মানজনক আয় পাবেন।

ডাক বিভাগের সংস্কারকে শুধু প্রশাসনিক প্রকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং জাতীয় বাজার সম্প্রসারণের প্রশ্ন। একজন গ্রামের নারী উদ্যোক্তা যদি তাঁর বাড়িতে তৈরি পণ্য সহজে ঢাকায় পাঠাতে পারেন, একজন কৃষক যদি প্রক্রিয়াজাত পণ্য জাতীয় বাজারে পাঠাতে পারেন, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি আন্তর্জাতিক পার্সেল পাঠানোর সুযোগ পান, তাহলে ডাকঘর আবার গ্রামের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন জরুরি পাঁচটি পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, ডাক বিভাগের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে জরুরি পর্যালোচনা করতে হবে। যাঁরা রাষ্ট্রীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের অমানবিক দারিদ্র্যের মধ্যে রেখে কোনো প্রতিষ্ঠান মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, ডাকসেবার ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য সময়সীমাবদ্ধ জাতীয় রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। এই রোডম্যাপে প্রযুক্তি, জনবল, অবকাঠামো, রাজস্ব, অংশীদারত্ব, গ্রাহকসেবা ও জবাবদিহির স্পষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, নির্বাচিত কয়েকটি জেলা ও উপজেলায় দ্রুত পাইলট ই-কমার্স লজিস্টিকস সেন্টার চালু করা যেতে পারে। ছয় মাসের মধ্যে ট্র্যাকিং, ক্যাশ অন ডেলিভারি, রিটার্ন ম্যানেজমেন্ট ও মার্চেন্ট পেমেন্ট চালু করার লক্ষ্য নেওয়া উচিত। পাইলট প্রকল্প সফল হলে এক বছরের মধ্যে বিভাগীয় শহর ও বড় উপজেলায় সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
চতুর্থত, স্বচ্ছ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কাঠামো তৈরি করতে হবে। অংশীদার নির্বাচন, রাজস্ব ভাগাভাগি, সেবার মান, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও কর্মচারীর প্রণোদনা বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকতে হবে। কোনোভাবেই এই রূপান্তর যেন নতুন ধরনের একচেটিয়া সুবিধা বা ব্যক্তিস্বার্থের জায়গা না হয়।

পঞ্চমত, ডাক বিভাগের কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নকে সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। প্রযুক্তি আসবে, কিন্তু মানুষকে বাদ দিয়ে নয়। কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করলে ডিজিটাল রূপান্তর কাগজে থাকবে, মাঠে নয়। সমস্যা সম্পদের অভাব নয়। সমস্যা পরিকল্পনার অভাব। সমস্যা দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব। সমস্যা যোগ্য মানুষকে কাজ করতে না দেওয়া। সমস্যা ভালো উদ্যোগকে টিকে থাকার পরিবেশ না দেওয়া। সমস্যা হলো, আমরা পুরোনো প্রতিষ্ঠানকে নতুন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে ভয় পাই, দেরি করি এবং শেষ পর্যন্ত সুযোগ হারাই।

আমরা কি শুধু ওই কর্মচারীর কান্না শুনে ভিডিওটি শেয়ার করব? নাকি এবার সত্যিই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করব, যেখানে তিনি ভাতা বা সহানুভূতি নয়, নিজের কাজের মাধ্যমে সম্মানজনক আয় করতে পারবেন?
                                                                                                                                      এ এইচ এম বজলুর রহমান: বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের (বিএনএনআরসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

ট্যাগঃ

ডিজিটাল যুগে একজন ডাককর্মীর কান্না এবং…

সময়ঃ ১২:০৪:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

একজন ডাক বিভাগের কর্মচারী ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন, তিনি মাসে মাত্র ৪ হাজার ৪৬০ টাকা বেতন পান। দিনে হিসাব করলে প্রায় ১৪৬ টাকা। এই টাকায় সংসার চলে না। সন্তানদের পড়াশোনা চালাতে হয়েছে ধার করে। কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।

এটি শুধু একজন নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীর ব্যক্তিগত কান্না নয়। এটি রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের অদক্ষ ব্যবহার, নীতিগত অবহেলা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। একজন কর্মচারীর চোখের পানি আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন তুলে ধরে, এত বিস্তৃত অবকাঠামো, এত পুরোনো প্রতিষ্ঠান, এত জনবল থাকার পরও বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কেন আজও দেশের ই-কমার্স, লজিস্টিকস ও ডিজিটাল সেবার কেন্দ্রে নেই?

প্রশ্নটি মানবিক, কিন্তু একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী। এই মানুষেরা কি কাজ করতে চান না? তাঁরা কি দায়িত্ব পালন করেন না? নাকি আমরা তাঁদের কাজকে সময়োপযোগী, আয়সৃষ্টিকারী ও মর্যাদাপূর্ণ করার মতো ব্যবস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি?

বাংলাদেশ ডাক বিভাগ একসময় মানুষের যোগাযোগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান ছিল। চিঠি, মানি অর্ডার, ভিপিপি, পার্সেল, সঞ্চয়পত্র, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক, সরকারি বার্তা, চাকরির নিয়োগপত্র, পরীক্ষার প্রবেশপত্র, আদালতের নোটিশ, বিদেশে থাকা আত্মীয়ের খবর—সবকিছুর সঙ্গে ডাক বিভাগের সম্পর্ক ছিল। ডাকপিয়ন শুধু সরকারি কর্মচারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানুষের অপেক্ষা, আনন্দ, দুঃখ ও সংবাদ বহনের এক মানবিক চরিত্র।

কিন্তু সময় বদলেছে। চিঠির জায়গা নিয়েছে মোবাইল ফোন, ই-মেইল ও মেসেঞ্জার। মানি অর্ডারের জায়গা নিয়েছে মোবাইলে আর্থিক সেবা। খবরের কাগজের অপেক্ষা কমেছে, মানুষ ফোনের পর্দায় খবর পড়ে। এই পরিবর্তন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু যোগাযোগের পুরোনো ধরন বদলে গেছে বলে ডাক বিভাগের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে, এমন ধারণা ভুল। বরং ই-কমার্স, পার্সেল ডেলিভারি, লাস্ট-মাইল লজিস্টিকস, ক্যাশ অন ডেলিভারি, রিটার্ন ম্যানেজমেন্ট, গ্রামীণ উদ্যোক্তা এবং ক্রস-বর্ডার বাণিজ্যের যুগে ডাক বিভাগের প্রয়োজন আরও বেড়ে যাওয়ার কথা ছিল।

বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার বিস্তৃত অবকাঠামো ও জনবল। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ডাকঘর, ডাককর্মী ও পরিচিত সেবাব্যবস্থার উপস্থিতি আছে। একটি বেসরকারি কুরিয়ার কোম্পানিকে যে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে বছরের পর বছর বিনিয়োগ করতে হয়, ডাক বিভাগের হাতে তার ঐতিহাসিক ভিত্তি আগে থেকেই ছিল। অথচ সেই শক্তিকে সময়োপযোগী করা যায়নি। ফলে একদিকে ডাক বিভাগের কর্মচারীরা অমানবিকভাবে কম আয়ে জীবন চালাতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশের দ্রুতবর্ধনশীল ই-কমার্স ও লজিস্টিকস বাজারে ডাক বিভাগের অংশগ্রহণ সীমিত থেকে যাচ্ছে।

এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেদনাদায়ক। একই সময়ে আরইডিএক্স, স্টিডফাস্ট, পাঠাও, সুন্দরবনসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম অবকাঠামো দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর পিকআপ, ট্র্যাকিং, ক্যাশ অন ডেলিভারি, মার্চেন্ট পেমেন্ট, রিটার্ন সার্ভিস এবং লাস্ট-মাইল ডেলিভারি ব্যবস্থা তৈরি করেছে। প্রতিদিন লাখ লাখ পণ্য দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে। শহরের তরুণ উদ্যোক্তা, অনলাইন ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ফেসবুকভিত্তিক নারী উদ্যোক্তা, গ্রামীণ উৎপাদক—সবাই কোনো না কোনোভাবে এই নতুন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সফলতাকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং তারা প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশে কার্যকর লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব। সঠিক প্রযুক্তি, দ্রুত সিদ্ধান্ত, গ্রাহকসেবা, ট্র্যাকিং, লেনদেন সমন্বয় এবং জবাবদিহি থাকলে মানুষ সেবা নেয়, উদ্যোক্তারা যুক্ত হয়, বাজার তৈরি হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই কাজের জন্য সবচেয়ে বড় সামাজিক ও ভৌগোলিক নেটওয়ার্কটি তো আগে থেকেই ডাক বিভাগের হাতে ছিল। তাহলে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান কেন সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারল না?

সমস্যা শুধু প্রযুক্তির নয়। প্রযুক্তি কেনা যায়, সফটওয়্যার বানানো যায়, অ্যাপ তৈরি করা যায়। আসল সমস্যা হলো ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহি ও প্রণোদনা–কাঠামোর দুর্বলতা। ভালো উদ্যোগ অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সিদ্ধান্তহীনতা, অস্বচ্ছতা, ব্যক্তিস্বার্থ, ঝুঁকি না নেওয়ার প্রবণতা এবং কার্যকর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের অভাবে আটকে যায়। যাঁরা অভিজ্ঞতা, সময়, অর্থ ও উদ্ভাবনী চিন্তা নিয়ে একটি ইকোসিস্টেম গড়তে চান, তাঁরা বারবার দরজায় কড়া নাড়েন, প্রস্তাব দেন, পাইলট প্রকল্প করতে চান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে সরে যেতে বাধ্য হন।

আজ যে ডাককর্মী ধার করে সন্তানকে লেখাপড়া করাচ্ছেন, তাঁর দায় শুধু কম বেতনের নয়। দায় এমন একটি ব্যবস্থার, যে ব্যবস্থা তাঁর শ্রমকে উৎপাদনশীল ও আয় সৃষ্টিকারী কাজে ব্যবহার করতে পারেনি। একজন কর্মচারী যদি কাজ করতে চান, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের কাঠামো তাঁকে নতুন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে না পারে, তাহলে সেটি কর্মচারীর ব্যর্থতা নয়, সেটি নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা। রাষ্ট্র তাঁকে নিয়োগ দিয়েছে, কিন্তু তাঁর কর্মক্ষেত্রকে আধুনিক করেনি। তাঁর দক্ষতা বাড়ায়নি। তাঁর শ্রমের বাজারমূল্য তৈরি করেনি।

অবশ্যই ডাক বিভাগের কর্মচারীদের ন্যায্য ও সম্মানজনক বেতন দিতে হবে। মাসে কয়েক হাজার টাকায় একজন মানুষ কীভাবে পরিবার চালাবেন, সন্তান পড়াবেন, চিকিৎসা করবেন, সামাজিক মর্যাদা রাখবেন? এই প্রশ্ন মানবিক, নৈতিক ও প্রশাসনিক। কিন্তু শুধু সরকারি বাজেট থেকে বেতন বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। কারণ, আয়হীন প্রতিষ্ঠানকে কেবল ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রাখা যায়, শক্তিশালী করা যায় না। ডাক বিভাগকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও রাজস্ব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে।

নীতিনির্ধারকদের এখন স্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ডাক বিভাগ কি শুধু অতীতের স্মৃতিবাহী একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে, নাকি এটি ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জাতীয় অবকাঠামোতে পরিণত হবে?

প্রতিটি ডাকঘর হতে পারে ই-কমার্স পণ্য গ্রহণ ও বিতরণকেন্দ্র। প্রতিটি ডাকঘর হতে পারে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের লজিস্টিকস হাব। প্রতিটি ডাকঘর হতে পারে ক্যাশ অন ডেলিভারি ও ডিজিটাল পেমেন্ট পয়েন্ট। প্রতিটি ডাকঘর হতে পারে রিটার্ন ও এক্সচেঞ্জ সেন্টার। প্রতিটি ডাকঘর হতে পারে আন্তর্জাতিক ও ক্রস-বর্ডার পার্সেল পাঠানোর কেন্দ্র। যেসব গ্রামে এখনো ভালো কুরিয়ার সেবা নেই, সেখানে ডাক বিভাগ সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। চরাঞ্চল, হাওর, পাহাড়, উপকূল, সীমান্ত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য এটি হতে পারে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাণিজ্যের অবকাঠামো।

এর জন্য সরকারকে সবকিছু নিজে পরিচালনা করতে হবে না। আবার সবকিছু বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলেই সমাধান হবে, এমন সরল ধারণাও বিপজ্জনক। দরকার স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব। দক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম এবং আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু নীতি, তথ্য, মানদণ্ড, গ্রাহক সুরক্ষা, কর্মচারীর অধিকার এবং রাজস্ব ভাগাভাগির ওপর রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারি থাকতে হবে।

ডিজিটাল রূপান্তরের মূল উপাদানগুলো হতে পারে তাৎক্ষণিক ট্র্যাকিং, নির্দিষ্ট ডেলিভারি সময়সীমা, ডিজিটাল রসিদ, গ্রাহক অভিযোগ নিষ্পত্তি, ক্যাশ অন ডেলিভারি ব্যবস্থাপনা, মার্চেন্ট পেমেন্ট, রিটার্ন ও এক্সচেঞ্জ সেবা, আন্তর্জাতিক পার্সেল ট্র্যাকিং, ডেটা সুরক্ষা, সেবা মানের সূচক এবং স্বাধীন নিরীক্ষা। শুধু অ্যাপ বানালেই ডিজিটালাইজেশন হয় না। ডিজিটালাইজেশন মানে হলো সেবা দ্রুত, স্বচ্ছ, পরিমাপযোগ্য, দায়বদ্ধ ও গ্রাহকবান্ধব হওয়া।

ডাক বিভাগের কর্মচারীদেরও নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করতে হবে। তাঁরা শুধু চিঠি বিলি করবেন না, তাঁরা হবেন ডিজিটাল লজিস্টিকস সহায়ক, গ্রামীণ ই-কমার্স সেবা প্রদানকারী, পার্সেল ম্যানেজার, পেমেন্ট সহায়ক ও গ্রাহকসেবা কর্মী। তাঁদের হাতে মোবাইল ফোন থাকবে, অ্যাপ থাকবে, ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকবে, ডিজিটাল রসিদ থাকবে। কর্মচারীর আয় শুধু বেতনে সীমাবদ্ধ না রেখে সেবাভিত্তিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠান আয় করবে, কর্মচারীরাও সম্মানজনক আয় পাবেন।

ডাক বিভাগের সংস্কারকে শুধু প্রশাসনিক প্রকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং জাতীয় বাজার সম্প্রসারণের প্রশ্ন। একজন গ্রামের নারী উদ্যোক্তা যদি তাঁর বাড়িতে তৈরি পণ্য সহজে ঢাকায় পাঠাতে পারেন, একজন কৃষক যদি প্রক্রিয়াজাত পণ্য জাতীয় বাজারে পাঠাতে পারেন, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি আন্তর্জাতিক পার্সেল পাঠানোর সুযোগ পান, তাহলে ডাকঘর আবার গ্রামের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন জরুরি পাঁচটি পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, ডাক বিভাগের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে জরুরি পর্যালোচনা করতে হবে। যাঁরা রাষ্ট্রীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের অমানবিক দারিদ্র্যের মধ্যে রেখে কোনো প্রতিষ্ঠান মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, ডাকসেবার ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য সময়সীমাবদ্ধ জাতীয় রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। এই রোডম্যাপে প্রযুক্তি, জনবল, অবকাঠামো, রাজস্ব, অংশীদারত্ব, গ্রাহকসেবা ও জবাবদিহির স্পষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, নির্বাচিত কয়েকটি জেলা ও উপজেলায় দ্রুত পাইলট ই-কমার্স লজিস্টিকস সেন্টার চালু করা যেতে পারে। ছয় মাসের মধ্যে ট্র্যাকিং, ক্যাশ অন ডেলিভারি, রিটার্ন ম্যানেজমেন্ট ও মার্চেন্ট পেমেন্ট চালু করার লক্ষ্য নেওয়া উচিত। পাইলট প্রকল্প সফল হলে এক বছরের মধ্যে বিভাগীয় শহর ও বড় উপজেলায় সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
চতুর্থত, স্বচ্ছ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কাঠামো তৈরি করতে হবে। অংশীদার নির্বাচন, রাজস্ব ভাগাভাগি, সেবার মান, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও কর্মচারীর প্রণোদনা বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকতে হবে। কোনোভাবেই এই রূপান্তর যেন নতুন ধরনের একচেটিয়া সুবিধা বা ব্যক্তিস্বার্থের জায়গা না হয়।

পঞ্চমত, ডাক বিভাগের কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নকে সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। প্রযুক্তি আসবে, কিন্তু মানুষকে বাদ দিয়ে নয়। কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করলে ডিজিটাল রূপান্তর কাগজে থাকবে, মাঠে নয়। সমস্যা সম্পদের অভাব নয়। সমস্যা পরিকল্পনার অভাব। সমস্যা দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব। সমস্যা যোগ্য মানুষকে কাজ করতে না দেওয়া। সমস্যা ভালো উদ্যোগকে টিকে থাকার পরিবেশ না দেওয়া। সমস্যা হলো, আমরা পুরোনো প্রতিষ্ঠানকে নতুন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে ভয় পাই, দেরি করি এবং শেষ পর্যন্ত সুযোগ হারাই।

আমরা কি শুধু ওই কর্মচারীর কান্না শুনে ভিডিওটি শেয়ার করব? নাকি এবার সত্যিই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করব, যেখানে তিনি ভাতা বা সহানুভূতি নয়, নিজের কাজের মাধ্যমে সম্মানজনক আয় করতে পারবেন?
                                                                                                                                      এ এইচ এম বজলুর রহমান: বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের (বিএনএনআরসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।