০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধ, ইরানের পাল্টা হুংকার

  • Sangbad365 Admin
  • সময়ঃ ১২:০১:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
  • ১৬০০২ Time View

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালি ও ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।

ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা) এই অবরোধ কার্যকর হয়, যা ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

অবরোধ অভিযান সফল করতে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্র ১৫টির বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে বলে জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা। ব্রিটিশ সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ইরানের বন্দর ছাড়াও পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং আরব সাগরের কিছু এলাকায় নৌ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, অবরোধের আওতায় থাকা জলসীমায় প্রবেশ করা যেকোনো জাহাজকে আটক, ঘুরিয়ে দেওয়া বা জব্দ করা হতে পারে।

ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি
অবরোধের পক্ষে অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, এর মূল লক্ষ্য ইরানের ‘ব্ল্যাকমেইল’ ও ‘চাঁদাবাজি’ থেকে বিশ্বকে রক্ষা করা।

তিনি আরো হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলে ইরানের ‘অ্যাটাক শিপ’ তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করা হবে। ট্রাম্প বলেন, সমুদ্রে মাদক চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, একই কৌশল প্রয়োগ করা হবে ইরানি জাহাজের ক্ষেত্রেও।

ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া
ইরান এই অবরোধকে ‘অবৈধ’ ও ‘দস্যুতার শামিল’ বলে আখ্যা দিয়েছে। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী সতর্ক করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির দিকে কোনো সামরিক জাহাজ অগ্রসর হলে তা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইরানি সশস্ত্র বাহিনী আরো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইরানের বন্দরগুলো যদি লক্ষ্যবস্তু হয়, তাহলে পারস্য উপসাগর বা ওমান সাগরের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।

যুদ্ধ বনাম ব্যর্থ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত শুরু হয়, যা দ্রুত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ৪০ দিনের যুদ্ধের পর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলাকালে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা হলেও কোনো সমঝোতা ছাড়াই তা শেষ হয়।

এর পরপরই ট্রাম্প ইরানের বন্দর অবরোধের ঘোষণা দেন।

‘কঠিন অভিযান’, বলছেন বিশ্লেষকরা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবরোধ বাস্তবায়ন সহজ হবে না। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মুহাম্মদ ইসলামি বলেছেন, এত বিশাল জলপথে ট্যাংকার ও সুপারট্যাংকার থামানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে তা উভয় পক্ষের জন্যই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।

বিশ্ববাজারে প্রভাবের আশঙ্কা
রাশিয়া এই অবরোধের সমালোচনা করে বলেছে, এটি বিশ্ববাজারের জন্য ক্ষতিকর হবে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের অনেক দিক এখনো অস্পষ্ট।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অবরোধ কার্যকর হলে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল বিশ্ববাজারে প্রবেশ করতে পারবে না, যা ইতোমধ্যেই চলমান জ্বালানি সংকটকে আরো তীব্র করে তুলতে পারে।

উত্তেজনার মধ্যেও চলাচল
অবরোধ শুরুর ঠিক আগে ইরান-সংশ্লিষ্ট দুটি তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে শিপিং ডেটা থেকে জানা গেছে, যা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তাকে আরো স্পষ্ট করে।

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বকেই তীব্র করেনি, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। উভয় পক্ষই কঠোর অবস্থানে থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে, যদিও এখনো অনেক দেশ কূটনৈতিক সমাধানের আশা ছাড়েনি।

ট্যাগঃ

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধ, ইরানের পাল্টা হুংকার

সময়ঃ ১২:০১:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালি ও ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।

ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা) এই অবরোধ কার্যকর হয়, যা ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

অবরোধ অভিযান সফল করতে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্র ১৫টির বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে বলে জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা। ব্রিটিশ সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ইরানের বন্দর ছাড়াও পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর এবং আরব সাগরের কিছু এলাকায় নৌ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, অবরোধের আওতায় থাকা জলসীমায় প্রবেশ করা যেকোনো জাহাজকে আটক, ঘুরিয়ে দেওয়া বা জব্দ করা হতে পারে।

ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি
অবরোধের পক্ষে অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, এর মূল লক্ষ্য ইরানের ‘ব্ল্যাকমেইল’ ও ‘চাঁদাবাজি’ থেকে বিশ্বকে রক্ষা করা।

তিনি আরো হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলে ইরানের ‘অ্যাটাক শিপ’ তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করা হবে। ট্রাম্প বলেন, সমুদ্রে মাদক চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, একই কৌশল প্রয়োগ করা হবে ইরানি জাহাজের ক্ষেত্রেও।

ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া
ইরান এই অবরোধকে ‘অবৈধ’ ও ‘দস্যুতার শামিল’ বলে আখ্যা দিয়েছে। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী সতর্ক করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির দিকে কোনো সামরিক জাহাজ অগ্রসর হলে তা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইরানি সশস্ত্র বাহিনী আরো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইরানের বন্দরগুলো যদি লক্ষ্যবস্তু হয়, তাহলে পারস্য উপসাগর বা ওমান সাগরের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।

যুদ্ধ বনাম ব্যর্থ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত শুরু হয়, যা দ্রুত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ৪০ দিনের যুদ্ধের পর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলাকালে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা হলেও কোনো সমঝোতা ছাড়াই তা শেষ হয়।

এর পরপরই ট্রাম্প ইরানের বন্দর অবরোধের ঘোষণা দেন।

‘কঠিন অভিযান’, বলছেন বিশ্লেষকরা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবরোধ বাস্তবায়ন সহজ হবে না। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মুহাম্মদ ইসলামি বলেছেন, এত বিশাল জলপথে ট্যাংকার ও সুপারট্যাংকার থামানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে তা উভয় পক্ষের জন্যই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।

বিশ্ববাজারে প্রভাবের আশঙ্কা
রাশিয়া এই অবরোধের সমালোচনা করে বলেছে, এটি বিশ্ববাজারের জন্য ক্ষতিকর হবে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের অনেক দিক এখনো অস্পষ্ট।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অবরোধ কার্যকর হলে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল বিশ্ববাজারে প্রবেশ করতে পারবে না, যা ইতোমধ্যেই চলমান জ্বালানি সংকটকে আরো তীব্র করে তুলতে পারে।

উত্তেজনার মধ্যেও চলাচল
অবরোধ শুরুর ঠিক আগে ইরান-সংশ্লিষ্ট দুটি তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে শিপিং ডেটা থেকে জানা গেছে, যা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তাকে আরো স্পষ্ট করে।

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বকেই তীব্র করেনি, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। উভয় পক্ষই কঠোর অবস্থানে থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে, যদিও এখনো অনেক দেশ কূটনৈতিক সমাধানের আশা ছাড়েনি।