বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে নতুন মডেল লাগবে বলে মত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, ‘সবার আগে বিনিয়োগ, সবার জন্য বিনিয়োগ ও সবার জন্য অর্থনীতি—আমাদের এখন এই মডেলে যেতে হবে।’
একই সঙ্গে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কৌশল হিসেবে ত্রিমুখী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পুনরুদ্ধার, পুনর্বহাল ও গতিশীলতার জন্য পুনর্গঠন—এই ত্রিমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
আজ বুধবার রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) কার্যালয়ে বাজেট নিয়ে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের (এসসিবি) সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাসের এজাজ বিজয়, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার, গবেষণা পরিচালক বজলুল হক খন্দকার, পরিচালক আহমদ আহসান ও এমসিসিআই পরিচালক হাসান মাহমুদ প্রমুখ।
বিনিয়োগ বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতা
আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বিনিয়োগকারীরা দেখতে চান, নীতির ধারাবাহিকতা আছে কি না। এটি বাজেট প্রস্তাবনায় আছে। ইতিহাসে এই প্রথম পাঁচ বছরের জন্য করকাঠামো উল্লেখ করা হয়েছে। অতীতে কখনো হয়নি।
দ্বিতীয়ত নিয়ন্ত্রণ শিথিলের কথা বলা হয়েছে। গণমাধ্যমে বলা হয়, এটা লাল ফিতার দৌরাত্ম্য। এটা কীভাবে কমানো যাবে, তার পথনকশা ও কৌশল বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। তৃতীয় বিষয় হচ্ছে অর্থায়ন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগের ফলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
এ সময় সরকারের কাজের সমালোচনা করার আহ্বান জানিয়ে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘আপনারা আমাদের সমালোচনা করেন। আমরা অতীতের মতো প্রশংসা বাক্য শুনতে চাই না। তারা প্রশংসা শুনে শুনে দেশ ডুবিয়ে দিয়ে পালিয়ে গেছে।’
রাজস্বে কাঠামোগত সংস্কার
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর দেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কার্যকর ‘রাজস্ব ও সুশাসন মডেল’ এবং পদ্ধতিগত সংস্কারে বিশেষ জোর দেন। তিনি বলেন, শুধু করের হার বা আওতা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং সুশাসন নিশ্চিত ও পদ্ধতিগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি।
বর্তমানে আইবাস পদ্ধতি (সরকারের সমন্বিত বাজেট ও হিসাবব্যবস্থার সফটওয়্যার/অনলাইন মাধ্যম) চালু হলেও অতীতের ভুল সংস্কৃতির কারণে কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি ও কর জালিয়াতির মতো সমস্যাগুলো রয়ে গেছে বলে জানান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, এই সংকট উত্তরণে ইনকাম ট্যাক্স, কাস্টমস ও ভ্যাট—এই তিন প্রধান ক্ষেত্রে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে প্রতি মাসে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সংশয়
২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এনবিআর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৫ শতাংশ রাজস্ব আহরণ করতে পেরেছে। এই বাস্তবতায় ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া নতুন অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত দুরূহ। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করেন এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান।
উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাপ থাকবে। এই বাস্তবতায় কামরান রহমান মনে করেন, মাঠপর্যায়ে করদাতারা হয়রানির শিকার হতে পারেন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
এসসিবির সাবেক সিইও নাসের এজাজ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট মানবিক বাজেট, এ কথা বলা যায়, তবে মূল জটিলতা লুকিয়ে আছে এর খুঁটিনাটি বিবরণের মধ্যে। তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন।
মূল্যস্ফীতিকে বড় বিষয় আখ্যা দিয়ে নাসের এজাজ বলেন, এটা কমাতে কী করা হবে, তা আরেকটু পরিষ্কারভাবে বলতে পারলে ভালো হতো। বিশেষভাবে দুর্নীতি কীভাবে বন্ধ করা হবে, তার জন্য পদক্ষেপ থাকলে ভালো হতো। ব্যাংকিং খাত সংস্কারের বিষয়ে আরেকটু বিস্তারিত আলোচনা দরকার ছিল।
প্রবৃদ্ধির ধাক্কা
গত পাঁচ বছরে অর্থনীতি একধরনের ‘প্রবৃদ্ধির ট্রমা’ বা ধাক্কার মধ্য দিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন পিআরআই চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার। অন্তর্বর্তী সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কিছুটা ফিরিয়ে আনতে পেরেছিল। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়ের কারণে অর্থনীতি এখনো প্রচণ্ড চাপে আছে।
জাইদি সাত্তার ব্যাংক খাত নিয়ে বাজেটে আরও বেশি জরুরি পদক্ষেপ আশা করেছিলেন। কেননা, ব্যাংক খাতের সংকট দূর না হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির ভঙ্গুর জায়গা হয়ে উঠতে পারে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা ঠিক না করে বাংলাদেশ বর্তমান মন্দা থেকে বের হতে পারবে না। ফলে ব্যাংকিং খাতের পুনরুদ্ধার দেশের প্রধান অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলে জানান তিনি।
Sangbad365 Admin 

